বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে নির্বাচন মানেই এক বিশাল উৎসব। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুম-সবখানেই চলে টানটান উত্তেজনা। কিন্তু আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। দেশের বর্তমান আবহাওয়া যেমন হাড়কাঁপানো শীতে জবুথবু, নির্বাচনী পরিবেশেও ঠিক তেমনি এক ধরনের স্থবির ও নিরুত্তাপ।
সোমবার প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমাদানের সময়সীমা শেষ হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের দলীয় কর্মীদের মাঝে উৎসব দেখা গেলেও সাধারণ মানুষের মাঝে চিরচেনা উদ্দীপনা দেখা যায়নি।
বড় দলের অনুপস্থিতি
আসন্ন নির্বাচনের সবচেয়ে বড় দিক হলো দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো বড় দলগুলো যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তখন মাঠপর্যায়ে এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের মাঠ থেকে দূরে আওয়ামী লীগ।
একটি বড় পক্ষ নির্বাচনে না থাকায় প্রতিযোগিতার যে উত্তাপ থাকার কথা, তা অনেকাংশেই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ভোটারদের একটি বড় অংশের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে নির্বাচনের প্রতি মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়।
জাতীয় পার্টির ভয়
নির্বাচনের আরেক উল্লেখযোগ্য দল জাতীয় পার্টির ভূমিকাও এবার বেশ সংকুচিত। দলটির প্রার্থীরা বিভিন্ন এলাকায় মনোনয়নপত্র জমা দিলেও তা ছিল অনেকটা গোপনীয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আশির্বাদপুষ্ট শক্তির হামলার ভয়ে তারা অনেকটা চুপিসারে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আগে যেখানে মিছিল-স্লোগান আর শত শত নেতাকর্মী নিয়ে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসতেন, এবার সেখানে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। দলটির প্রার্থীদের এই ‘ভীতি’ নির্বাচনী আমেজকে আরও বেশি ম্লান করে দিয়েছে।
অতীত বনাম বর্তমান: একটি তুলনা
পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। পুরো রাজনৈতিক পরিবেশকেই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপরও নির্বাচন ঘোষণার পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগেই দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ। পূর্ণ শক্তিতে মাঠে নেমেছিল প্রতিটি দল, ভোটারদের মাঝেও ছিল ব্যাপক উৎসাহ।
কিন্তু বর্তমানের পরিস্থিতি তার ঠিক উল্টো। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আয়োজিত এই নির্বাচনে তেমন পরিবেশ তৈরি হয়নি। বড় এক দলের অনুপস্থিতিতে মানুষ যেন ধরেই নিয়েছে কারা আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী হচ্ছে। আগে ফাঁস হয়ে যাওয়া পরীক্ষার ফল যেমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণার সময় উত্তেজনা ম্লান করে দেয়, বর্তমান পরিবেশও ঠিক তেমনই।
২০১৪, ২০১৮ কিংবা ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের পরিবেশও ছিল এখনকার মতোই নিষ্প্রভ। বড় দল বিএনপির ভোট বর্জনে ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়েও মানুষের কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে সেবার নির্বাচনী উত্তাপ না থাকলেও ভোট প্রতিরোধের আন্দোলনে চাঙ্গা ছিল রাজনৈতিক অঙ্গন।
পরের বার ২০১৮ সালের নির্বাচনী বিএনপি-জামায়াত জোট অংশ নিলেও দলীয় সরকারের অধীনে সেই নির্বাচনের ফলাফল ছিল অনেকটাই পূর্ব-নির্ধারিত। এ কারণে সেবারও নির্বাচন নিয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। শেষ পর্যন্ত আগের রাতেই হয়ে গিয়েছিল সেই নির্বাচন।
আর ২০২৪ সালের নির্বাচনটি ছিল আমি আর ডামি প্রার্থীর ভোট। সাধারণ মানুষ আগেই বুঝে গিয়েছিল কোথায় কে জিততে চলেছে। তাই নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ছাড়া আর কারও আগ্রহ ছিল না।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে মানুষ যেমন কাজে বের হতে অনীহা বোধ করছে, নির্বাচনের ক্ষেত্রেও যেন তাদের একই মনোভাব। সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা নেই বললেই চলে। হাট-বাজারে যেখানে নির্বাচনের পোস্টার আর মাইকিংয়ে কান পাতা দায় হতো, সেখানে এখন শুধুই নীরবতা। সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্ন-প্রতিযোগিতা যদি একতরফা বা সীমিত হয়, তবে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে লাভ কী? এই মানসিকতাই নির্বাচনী উত্তাপকে শীতল করে দিয়েছে।
এখনো শঙ্কা
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে, প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন, এমনকি মনোনয়নপত্র জমাদানের পর্বও শেষ হয়ে গেছে। এরপরও অনেকের মনে রয়ে গেছে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা। সাংবাদিক কিংবা কোনো রাজনীতিবিদকে সামনে পেলেই অনেকে প্রশ্ন করেন: ‘শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে তো।’
এমন প্রশ্ন করার কারণ তফসিল ঘোষণার পরেও দেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠার মতো বেশ কয়েকটি ঘটনা। মানুষের সন্দেহ, নির্বাচন বাতিল করতেই কি এসব ঘটনা ঘটছে? অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের এই সন্দেহ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।


