গত শুক্রবার নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি অডিও বার্তা প্রচার করতে দেওয়ার মাধ্যমে ভারত একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। এতে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে, ভারত যখনই প্রয়োজন মনে করবে তখনই ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
শুরু থেকেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের মাটি থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ঢাকার এই উদ্বেগকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, নয়াদিল্লির অবস্থান বাংলাদেশের সংবেদনশীলতার চেয়ে তাদের নিজস্ব কৌশলগত হিসাব-নিকাশেই বেশি চলছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকারই গঠিত হোক না কেন, ভারত আগামী দিনগুলোতে ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। তারা বলছেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকাকে অবশ্যই ভারতের জাতীয় স্বার্থ এবং শেখ হাসিনা ইস্যুটিকে আলাদা করে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘কূটনীতিতে আবেগের কোনো জায়গা নেই, এখানে জাতীয় স্বার্থই আসল। ভারতের অগ্রাধিকার হচ্ছে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, শেখ হাসিনা নন। ঢাকাকে এই সত্যটি বুঝতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে সম্পর্ক আটকে রাখা বাংলাদেশের উচিত হবে না। হাসিনাকে কেন্দ্র করে ভারতে কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হচ্ছে তা পাশে সরিয়ে রেখে বরং বৃহত্তর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে নয়াদিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা উচিত।’
অন্য একজন সাবেক কূটনীতিক গত বছরের এপ্রিলে একটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেন। তখন ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল।
সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘ওই বৈঠকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে দিল্লি শেখ হাসিনাকে নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী ছিল না।’ তার মতে, ঢাকা হয়তো তখন ভারতের দেওয়া সেই বার্তাটি সঠিকভাবে বুঝতে পারেনি।
‘রাজনীতি ও কূটনীতির তুলনা করে এই কূটনীতিক বলেন, রাজনৈতিক শত্রুতা প্রায়ই সাময়িক হয়। রাজনীতিবিদরা প্রায়ই একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর কথা বলেন, কিন্তু পরে আবার একসাথে বসে চা খান। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি খাটে। এখানে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—আছে কেবল স্থায়ী স্বার্থ,’যোগ করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকার উভয়কেই ভারতের বিষয়ে একটি পরিষ্কার ও ধারাবাহিক নীতি তৈরি করতে হবে। তাদের ঠিক করতে হবে যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কি শেখ হাসিনা ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত থাকবে নাকি থাকবে না।
তারা বলছেন, নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্থিতিশীল করার জন্য এই কৌশলগত স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি।


