নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতার বিভিন্ন অভিযোগকে কেন্দ্র করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) প্যাডে প্রকাশিত একটি বিবৃতি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন সংগঠনের ভিপি ও জিএস।
জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু বলছেন, তার সম্মতি ছাড়াই সংগঠনের ব্যানারে দেওয়া এ বিবৃতির মাধ্যমে ‘ইসলামী ছাত্র শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়ন’ করা হচ্ছে।
যদিও জিএস মাজহারুল ইসলামের দাবি, সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতেই বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়েছে।
শনিবার প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচন-পরবর্তী হামলা, ভাঙচুর, ধর্ষণ ও সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়।
সেখানে স্পষ্ট করে নোয়াখালীর হাতিয়ায় শাপলা-কলিতে ভোট দেওয়ার এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়।
যদিও এ অভিযোগটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত রয়েছে। ভুক্তভোগী হিসেবে দাবি করা নারী, অভিযুক্ত বিএনপি নেতা, প্রশাসন এবং হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের মধ্যে গড়মিল দেখা গেছে। এখনো ওই নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়ায় বিষয়টি নিশ্চিতও হওয়া যায়নি।
এ বিষয়টি বিবৃতিতে উল্লেখ করাও ভিপি-জিএসের মতবিরোধের কারণ।
জাকসুর বিবৃতিতে শুধু জিএসের সই থাকায় বিষয়টি সামনে আসতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু। তিনি জানান, এ বিবৃতির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নেই।
ভিপি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগগুলো জাতীয় গণমাধ্যম বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে নিশ্চিত হওয়ার আগে তিনি বিবৃতি দেওয়ার পক্ষে সম্মতি দেননি। এ বিষয়ে তিনি জিএসকে নিজের আপত্তির কথা অবহিত করেছিলেন বলেও দাবি করেন।
তার ভাষ্য, সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন, জাকসুর প্যাডে একক স্বাক্ষরে বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে।
জাকসুকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ভিপি আরও বলেন, জাকসু সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া বিবৃতি দেওয়া সংগঠনটির নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
মতপার্থক্য থাকলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাকসুর সভাপতি তথা উপাচার্যের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা উচিত ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেন, ভিপি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, যদিও তিনি সময় নিতে চেয়েছিলেন। জাকসুর অধিকাংশ সম্পাদক ও নির্বাচিত প্রতিনিধির মতামতের ভিত্তিতেই বিবৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি তার।
তিনি আরও বলেন, জাকসুতে কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া হয় না; সংখ্যাগরিষ্ঠের মতই চূড়ান্ত।
বিবৃতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জিএস বলেন, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতেই বিবৃতি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সেখানে কেবল সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
একে দলীয় বা পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যা দেওয়া ঠিক না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, জিএসের একক স্বাক্ষরে বিবৃতি দেওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন হল সংসদের কয়েকজন নেতাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
যার মধ্যে শহীদ সালাম-বরকত হলের জিএস মো. মাসুদ রানা, এজিএস তাইফ আজিম এবং মওলানা ভাসানী হলের সমাজসেবা সম্পাদক তানজির হিমেল অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাকসুর প্যাড ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ভিপি পদে জয়ী হন আবদুর রশিদ জিতু। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অবস্থানের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার বেশ জনপ্রিয়তা ছিল। ফলে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেল থেকে জয় পান তিনি। অবশ্য গত ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।
অন্যদিকে জাকসুর জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মাজহারুল ইসলাম নির্বাচন করেছিলেন শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই সংগঠনটির শীর্ষ দুই পদের নেতার মধ্যে স্পষ্ট রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। যা ক্রমেই প্রকাশ্য হয়ে উঠছে।


