নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অপরাধের শাস্তি বাড়ানো হচ্ছে। নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ (১৯৯১ সালের ১৩ নম্বর আইন) সংশোধন করে অধ্যাদেশের খসড়ায় এমন বিধান রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ খসড়াসহ বেশ কিছু প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
সভায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ (২০০৯ সালের ৫ নম্বর আইন) সংশোধন এবং ‘অর্থসংক্রান্ত কতিপয় আইন (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বৈঠকের বিষয়ে জানান।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনসংক্রান্ত দুটি আইন সংশোধনের ফলে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাবে। বিশেষ করে নির্বাচনী দায়িত্বে অবহেলা করলে শাস্তির বিধান আরও স্পষ্ট হবে।’

নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১-এর সংশোধনে ধারা ২, ধারা ৫ ও ধারা ৬-এ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচন কর্মকর্তার সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণ, শৃঙ্খলামূলক শাস্তি-সংক্রান্ত ধারা হালনাগাদ এবং নতুন উপধারা সংযোজন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত হলে গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া তিনি দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানাতে পারবেন না। বিদ্যমান আইনে এ ধরনের অস্বীকৃতির সাজা ছিল এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। এখন অর্থদণ্ডের পরিমাণ বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া কোনো কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্বে অসদাচরণ করলে বিদ্যমান আইনে তার সাজা ছিল ছয় মাসের কারাদণ্ড বা দুই হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। সংশোধিত আইনে সর্বনিম্ন এক বছর থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো নির্বাচন কর্মকর্তা নির্বাচন-সংক্রান্ত বিষয়ে কমিশন বা কমিশনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিংবা রিটার্নিং অফিসারের আদেশ বা নির্দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করলে, আইন লঙ্ঘন করলে বা কর্তব্যে অবহেলা করলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অসদাচরণ চাকরিবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ সংশোধনের প্রস্তাবও অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। এর আওতায় ধারা ৩-এর উপধারা (৪) প্রতিস্থাপন করে একটি ‘নির্বাচন কমিশন সার্ভিস’ গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদ এনবিআরের উদ্যোগে প্রণীত ‘অর্থসংক্রান্ত কতিপয় আইন (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়ারও নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। বাসস জানিয়েছে, এই অধ্যাদেশের আওতায় মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ সংশোধন করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষ আদেশ দ্বারা ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি আয়কর আইন ২০২৩ সংশোধনের মাধ্যমে সরকারি সিকিউরিটি বা অনুমোদিত সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানি করদাতার উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত বাস ও পরিবহন খাতে কর সংগ্রহকে চূড়ান্ত করযোগ্য আয় হিসেবে গণনার বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
সংস্কার কার্যক্রম নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। শফিকুল আলম বলেন, ‘বৈঠকে পূর্ববর্তী ব্যাচে গৃহীত ১২১টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ৭৭টির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি বাস্তবায়িত, ১৪টি আংশিক বাস্তবায়িত এবং বাকিগুলো বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।’
তিনি জানান, সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উপদেষ্টাদের উদ্যোগে আরও অনেক সংস্কার বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে নিজস্ব উদ্যোগে বাস্তবায়িত সংস্কারের তালিকা দ্রুত জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী মাসে এসব সংস্কারের সংকলন বুকলেট আকারে প্রকাশ করা হবে, যাতে সংস্কারের পূর্ণ চিত্র সবার সামনে উপস্থাপন করা যায়।


