ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনায় দলের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রস্তাবিত নির্বাচনী ইশতেহারের মূল ধারণা তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘পলিসি সামিটে’ দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্টজন এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে দলের নীতিনির্ধারকেরা এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
এদিন সকালে শুরু হওয়া দিনব্যাপী এই সামিটে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। সমাপনী পর্বেও তিনি বক্তব্য দেন। কয়েকটি সেশনে নানা বিষয়ে প্রশ্নেরও উত্তর দেন দলটির নেতারা।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, ভারত, জার্মানি, ফ্রান্স, কোরিয়া, পাকিস্তান, ইরান, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, মালদ্বীপ, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কাসহ প্রায় ৩০টির বেশি দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি সামিটে অংশ নেন।
নীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা
সামিটে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। দীর্ঘ মেয়াদে করহার ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা একীভূত করে ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। আগামী তিন বছরে শিল্পখাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানো হবে না বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়।
বন্ধ কলকারখানা পিপিপি ভিত্তিতে চালু করে শ্রমিকদের ১০ শতাংশ মালিকানা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব নীতি, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণের কথাও তুলে ধরা হয়।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত
প্রতিবছর দরিদ্র ও মেধাবী ১০০ শিক্ষার্থীকে হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজসহ বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
এ ছাড়া ইডেন কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ একীভূত করে বিশ্বের বৃহত্তম নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেয় জামায়াত।
সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগ হবে সম্পূর্ণ মেধাভিত্তিক। স্বাস্থ্যখাতে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিক এবং পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় অনুষ্ঠানে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
জামায়াত আমির শফিকুর রহমান ও দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী আপসহীন থাকবে।
তারা বলেন, দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে তিনি কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
সংখ্যালঘু অধিকার নিশ্চিতের নিশ্চয়তা
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষাকে কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ‘ধর্মীয় কর্তব্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন জামায়াত নেতারা। তারা জানান, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী প্রায় পাঁচ লাখ সদস্য রয়েছেন।
জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করবে না জামায়াত।
আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও ঐক্যের আহ্বান
জামায়াত আমির শফিকুর রহমান বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সময় বিভাজনের নয়, বরং একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সময়।
তরুণ, আইসিটি ও রেমিট্যান্স পরিকল্পনা
তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং ৫০ লাখ মানুষের চাকরি সংযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আইসিটি খাতে ‘ভিশন ২০৪০’ -এর আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ কর্মসংস্থান এবং ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে আগামী কয়েক দশকে রেমিট্যান্স আয় দুই থেকে তিনগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।


