ঘরের মাঠে টেস্ট ম্যাচে বাংলাদেশের পেসাররা বলে-কয়ে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের উইকেট নিচ্ছেন, নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছেন; এমন দৃশ্যই আজীবন দেখতে চেয়েছে সবাই। নাহিদ রানার পাঁচ উইকেটের সাথে তাসকিন আহমেদের গতির তোপে মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে চোখের সেই তৃষ্ণা মিটল বাংলাদেশের। মিরপুরে দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টের পঞ্চমদিন পাকিস্তানকে ২৬৮ রানের লক্ষ্য দিয়ে এই দুজন মিলে তাদের গুড়িয়ে দিলেন ১৬৩ রানে। ১০৪ রানের জয়ে সিরিজে এগিয়ে গেল ১-০ ব্যবধানে।
যে পাকিস্তান এতদিন বাংলাদেশের ঘরের মাঠে অপরাজেয় ছিল, তাদেরই মাটিতে নামিয়ে আনল স্বাগতিকরা। এই টেস্টের আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ৮ ম্যাচ খেলে ড্র করেছিল কেবল একটি। ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল ৪টিতে। এবার বড় জয়ে ঘরের মাঠে সেই আফসোসও ঘুচল।
শেষ দিন লাঞ্চ ব্রেকের ১৫ মিনিট আগে ৯ উইকেটে ২৪০ রানে ইনিংস ঘোষণা করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। মিরপুর টেস্টের শেষ দিন চতুর্থ ইনিংসে পাকিস্তানের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৬৮ রান, যা তাড়া করে জিততে হলে রেকর্ডই গড়তে হবে তাদের। কারণ এই মাঠে চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ ২০৯ রান তাড়ার রেকর্ড ছিল ইংল্যান্ডের, তাও ২০১০ সালে। ১৬ বছরের পুরনো সেই রেকর্ড ভাঙা দূর, দিনের শেষ সেশনজুড়ে বরং ধুঁকল তারা।
যার অগ্রভাগে ছিলেন এক্সপ্রেস পেসার নাহিদ রানা। দিনের প্রথম সেশনে ৫ ওভারের স্পেলে পেয়েছিলেন শান মাসুদের উইকেট। চা-বিরতির পর দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে নিয়েছেন আরো চার উইকেট। শুধু যে উইকেট নিয়েছেন তা নয়, গতির ঝড়ে অস্থির করে রাখেন পাকিস্তানি ব্যাটারদের। মোহাম্মদ রিজওয়ানের সাথে ৩১ রানের জুটি গড়া সৌদ শাকিলকে রিভার্স সুইংয়ে ফিরিয়ে শুরু, লিটনের হাতে ক্যাচ দেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।
এরপর দুর্দান্ত এক ইন সুইংগারে বোল্ড করেছেন রিজওয়ানকে। গুড লেংথে পিচ করা বল না খেলে লিভ করেছিলেন রিজওয়ান, কিন্তু রানার তুমুল গতির লেংথ ডেলিভারির লেট মুভমেন্টে বোল্ড হন এই ডানহাতি ব্যাটার। এক ওভার পর নোমান আলী ফিরেছেন তার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে। জয়টাও এসেছে নাহিদের বলেই। তার বাউন্সার সামলাতে পারেননি শাহীন শাহ আফ্রিদি। গ্লাভস ছুঁয়ে বলে উড়ে যায় শর্ট লেগে থাকা মাহমুদুল হাসান জয়ের হাতে। একইসাথে নিশ্চিত হয় টেস্ট ক্রিকেটে নাহিদের দ্বিতীয় ফাইফার ও বাংলাদেশের ১০৪ রানের জয়।
তবে পাকিস্তানকে প্রথম ঝটকা দিয়েছিলেন তাসকিন আহমেদ। ইনিংসের প্রথম ওভারের শেষ বলে উইকেটের পেছনে লিটনের হাতে ক্যাচ দেন ইমাম উল হক। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা অভিষিক্ত বাঁহাতি ব্যাটার আজান আওইয়াইস থেমেছেন মেহেদী হাসান মিরাজের বলে বোল্ড হয়ে। ৩৩ বলে ১৫ রান করেন তিনি। ৫৭ রানে ২ উইকেট হারানো দলের অধিনায়ক শান ফিরেন ১১ রানের ব্যবধানে। নাহিদের গুড লেংথ বলে ব্যাট ছুঁইয়ে লিটনের হাতে ক্যাচ দিয়ে।
শুরুর ধসের পর ৫১ রানের জুটিতে প্রতিরোধ গড়েছিলেন আবদুল্লাহ ফজল ও সালমান আলী আগা। চা-বিরতি থেকে ফিরে ইনিংসের ৩২তম ওভারে তাইজুল ইসলামের ঘূর্ণিতে কাটা পড়েন ৬৬ রানের ইনিংস খেলে ফজল। তাইজুলের টার্নে পরাস্ত হয়ে লেগ বিফোরের শিকার হন এই অভিষিক্ত ক্রিকেটার। এর এক ওভার পর তাসকিন ফেরান সালমান আলী আগাকে। সব মিলিয়ে নাহিদের ৯.৫ ওভার বল করে ৪০ রানে ৫ উইকেট নেন নাহিদ, যা তার ক্যারিয়ার সেরা বোলিং ফিগার। মিরাজ একটি, তাসকিন এবং তাইজুল নেন দুটি করে উইকেট।
এর আগে টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে শান্তর সেঞ্চুরি, মুমিনুল হকের ৯১ ও মুশফিকুর রহিমের ৭১ রানের ইনিংসে ৪১৩ রানে প্রথম ইনিংসে অল আউট হয় বাংলাদেশ। দুই ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয় ও সাদমান ইসলাম ব্যর্থ হলে তৃতীয় উইকেটে রেকর্ড ১৭০ রানের জুটি গড়েন মুমিনুল ও শান্ত, যা পাকিস্তানের বিপক্ষে এই জুটিতে সর্বোচ্চ।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে মিরাজের ক্যারিয়ারের ইনিংসে ১৫-তম পাঁচ উইকেটের পরেও আজান আওয়াইসের সেঞ্চুরি, ফজলের ৬০ ও সালমান-রিজওয়ানের জোড়া ফিফটিতে ৩৮৬ রান করে পাকিস্তান। দ্বিতীয় ইনিংসে ২৭ রানের লিড নিয়ে ব্যাট করতে নেমে ৯৮ উইকেটে ২৪০ রানে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। লিড দাঁড়ায় ২৬৭, এই ইনিংসেও ব্যাট হাতে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শান্ত। যদিও ১৩ রানের জন্য মিস করেছেন নিজের দশম সেঞ্চুরি। ৮৭ রানে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বাঁহাতি স্পিনার নোমানের বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি।


