উৎসবমুখর পরিবেশে বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে শেষ হলো দু’দিন ব্যাপী ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি মেলা। শতাব্দী প্রাচীন এই মেলায় এবার প্রায় এক কোটি টাকার শুঁটকি বেচাকেনা হয়েছে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা।
উপজেলার কুলিকুণ্ডা (উত্তর) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বুধবার সকালে এই মেলা শুরু হয়। দেশীয় নানা প্রজাতির মাছের শুঁটকির পাশাপাশি এবার সামুদ্রিক মাছের শুঁটকিও প্রচুর পরিমাণে দেখা গেছে।
মেলার প্রধান পণ্য শুঁটকি হলেও মাঠের বাইরের অংশে বসেছিল গ্রামবাংলার লোকজ পণ্যের পসরা। স্থানীয় কুমারদের হাতের তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, ঝাঁঝর, থালা ও মাটির পুতুলসহ নানা সামগ্রী মেলায় নজর কেড়েছে।
এবার শুঁটকির দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। মানভেদে প্রতি কেজি শুঁটকি সর্বনিম্ন ৬০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। মেলায় শোল শুঁটকি ১৪০০ থেকে ১৭০০ টাকা, বাইন ১৮০০ টাকা, আইড় ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকা, টুনা ১৫০০ টাকা এবং ইলিশ শুঁটকি ১২০০ টাকা কেজি দরে কেনাবেচা হয়েছে।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, দুই থেকে তিনশ বছর ধরে কুলিকুণ্ডা গ্রামবাসী এই মেলার আয়োজন করে আসছে। এক সময় পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে এখানে শুঁটকি কেনা-বেচা হতো। বর্তমানে শুটকির চড়া দামের কারণে এই বিনিময় প্রথা বিলুপ্তির পথে। এখন মূলত নগদ টাকাতেই কেনাবেচা চলে। তবে ঐতিহ্যের খাতিরে মেলা শুরুর প্রথম এক ঘণ্টা সীমিত পরিসরে পণ্য বিনিময়ের সুযোগ রাখা হয়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোজনরসিক ও ব্যবসায়ীরা এই মেলায় ভিড় করেন। সিলেট, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন।
সরাইলের ব্যবসায়ী আবদুর রহমান তার ভাতিজা আরমান মিয়াকে নিয়ে মেলায় এসেছেন। তিনি জানান, তার বাবা নূর আহমেদ ও দাদাও এই মেলায় আসতেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনিও এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। হবিগঞ্জের লাখাই থেকে ১৫ পদের শুঁটকি নিয়ে এসেছেন মহেশ্বর দাস। ভালো বিক্রিতে সন্তুষ্ট তিনি।
স্থানীয় কৃষক বাহার মিয়া জানান, এই অঞ্চলে মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতে শুঁটকি উপহার পাঠানোর একটি সুন্দর রেওয়াজ রয়েছে। গোকর্ণ ইউনিয়নের জেঠাগ্রাম থেকে আসা জোস্না চৌধুরী জানান, তিনি নিজের জমির আম, পেঁয়াজ, চাল ও সবজি দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শুঁটকি বিনিময় করেছেন।
এছাড়া হরিণবেড় গ্রামের রামেশ্বর দাস জানান, তিনি গত বছর দুই দিনে প্রায় দেড় লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি করেছিলেন।
মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য হোসাইন আহমেদ বলেন, এই মেলা পুরো জেলার ঐতিহ্য। এখানে কোনো চাঁদাবাজি নেই। আগামী বছর আরও বড় পরিসরে মেলা আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনা নাসরিন জানান, বহু বছরের পুরনো এই মেলায় নিরাপত্তার জন্য পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখেই সুন্দরভাবে মেলা শেষ হয়েছে।


