দেশে ‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। যাপিত জীবনে, আড্ডায় কিংবা চায়ের দোকানে অনেকেই নিজেদের মধ্যবিত্ত পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। এই পরিচয়ের পেছনে কাজ করে এক ধরনের মানসিক সান্ত্বনা। আভিধানিক অর্থে মধ্যবিত্ত হলো ধনী ও দরিদ্রের মাঝামাঝি একটি অর্থনৈতিক স্তর। বাস্তবে বাংলাদেশে এই সংজ্ঞার কোনো অস্তিত্ব আছে কি? বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিষয়টি নিয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে।
সমাজে মধ্যবিত্ত বলতে অর্থনৈতিক অবস্থার চেয়ে জীবনযাত্রার ধরনকে বেশি বোঝানো হয়। শিক্ষিত, সুশীল, ভদ্রলোক ও ‘বাবু’ শ্রেণির অবয়ব তৈরিতেই এই শব্দের সার্থকতা। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো। জীর্ণ পকেট নিয়েও আভিজাত্য বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলে এখানে। এটি এক ধরনের আত্মতুষ্টি। নিজেকে দরিদ্র ভাবলে যে সামাজিক অমর্যাদা তৈরি হয়। তা থেকে বাঁচতেই মানুষ মধ্যবিত্তের খোলস গায়ে জড়ায়। প্রকৃত অর্থনৈতিক সূচকে এই শ্রেণির সুনির্দিষ্ট কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া দায়।
প্রকৃত সত্য হলো, দেশে মানুষের শ্রেণি মূলত দুটি। এক দল দরিদ্র, অন্য দল ধনিক শ্রেণির লুটেরা। মধ্যবর্তী কোনো ফাঁকা জায়গা সমাজ বাস্তবতায় নেই। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ত্রুটি ও তীব্র বৈষম্যের কারণে সমাজ আজ স্পষ্ট দুই ভাগে বিভক্ত। মাঝখানের তথাকথিত সেতুটি ভেঙে পড়েছে অনেক আগেই।
পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে দারিদ্র্যের হার কম দেখানো হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেশের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে দরিদ্র। নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাজারে যারা প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন, তারা আর যাই হোক মধ্যবিত্ত নন। চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের খরচ মেটাতে গিয়ে যাদের ঋণগ্রস্ত হতে হয়, তাদের দরিদ্র বলাই শ্রেয়। সামান্য আয়ের মানুষ মুখ বুজে কষ্ট সহ্য করছেন সামাজিক সম্মানের ভয়ে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী আসলে প্রান্তিক দারিদ্র্যেরই অংশ।
অর্থনীতির ওপরের স্তরে বসে আছে মাত্র দশ শতাংশ মানুষ। এরা ধনিক শ্রেণি। এই শ্রেণির বড় অংশ গড়ে উঠেছে অবৈধ সম্পদ, ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও নানা প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের মাধ্যমে। দেশের সিংহভাগ সম্পদ এই মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে বাজারের নিয়ন্ত্রণ সবই এদের কবজায়। এই বৈষম্যমূলক কাঠামো সমাজকে দ্বিমুখী করে তুলেছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তথাকথিত মধ্যবিত্তের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। চাল, ডাল, তেল ও ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। একজন প্রকৃত মধ্যবিত্তের সঞ্চয় থাকার কথা। এ দেশে সিংহভাগ মানুষের মাস শেষে কোনো সঞ্চয় থাকে না। প্রতিদিনের খরচ মেটানোই যেখানে যুদ্ধ, সেখানে মধ্যবিত্ত তকমা ধরে রাখা স্রেফ আত্মপ্রতারণা।
একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার কথা নামমাত্র মূল্যে। দেশে এই দুটি খাত এখন পুরোপুরি বাণিজ্যিক। ভালো মানের পড়াশোনা ও সুচিকিৎসার জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। ধনিক শ্রেণি বিদেশে ও নামি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুবিধা পায়। বাকি নব্বই শতাংশ মানুষ সরকারি ভাঙাচোরা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তারা ধারদেনা করে বেসরকারি খরচের বোঝা টানে। এই অর্থনৈতিক চাপ প্রমাণ করে, মাঝামাঝি থাকার কোনো সুযোগ এ দেশে নেই।
দেশের কর ব্যবস্থার সিংহভাগ চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের কারণে ধনী-দরিদ্র সবাইকে সমান মূল্য চোকাতে হয়। অথচ রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধার বেলায় সাধারণ মানুষ বঞ্চিত। ধনিক শ্রেণি কর ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যায়। সাধারণ মানুষ কর দিয়েও নাগরিক নিরাপত্তা পায় না। এই শোষণমূলক ব্যবস্থা প্রমাণ করে, মধ্যবিত্ত ধারণাটি বিভ্রম মাত্র।
নিজেকে মধ্যবিত্ত ভাবা মূলত এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ঢাল। ‘আমি গরিব নই’ ভাবনাটুকু মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামোগত শোষণকে আড়াল করতেই এই ধারণাকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। শোষিত মানুষ যখন নিজেকে শোষিতের কাতার থেকে আলাদা ভেবে সান্ত্বনা খোঁজে, তখন শোষকের সুবিধা হয়।
দেশ আজ এক চরম অর্থনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে মাঝামাঝি কোনো অবস্থান নেই। ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আকাশচুম্বী। নিজেকে মধ্যবিত্ত ভাবার সাময়িক আনন্দ থাকলেও, বাস্তবতার কঠোর আলোয় তা মিলিয়ে যায়। এ দেশের নব্বই শতাংশ মানুষই আসলে অধিকারবঞ্চিত। যাদের প্রকৃত পরিচয় দরিদ্র। বাকি দশ শতাংশ লুটেরা ধনিক শ্রেণি। এই কঠিন সত্য মেনে নেওয়াই হবে বাস্তবসম্মত।
লেখক : সহসম্পাদক, টাইমস অব বাংলাদেশ


