রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এতে তার কারামুক্তি আটকে গেল।
শনিবার পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হকের আদালত এ আদেশ দেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, সাতটি মামলায় জামিন বহাল থাকার পর সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে আবারও নতুন করে আরেকটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখান হলো। এর ফলে এখনই তার কারামুক্তি হচ্ছে না।
এর আগে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যাত্রাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক মো. ইব্রাহিম খলিল গত ১৬ মে এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আদালত খায়রুল হকের উপস্থিতিতে শুনানির জন্য শনিবার দিন ধার্য করেন।
আবেদনে বলা হয়েছে, এই মামলার তদন্তেপ্রাপ্ত আসামি এ বি এম খায়রুল হক। তিনি বর্তমানে জেলহাজতে আটক আছেন। তার বিরুদ্ধে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক স্বাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষে তদন্তের স্বার্থে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো একান্ত প্রয়োজন।
এর আগে শনিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে পুলিশ প্রহরায় খায়রুল হককে হুইল চেয়ারে ও মাথায় হেলমেট পরিয়ে আদালতের হাজতখানা থেকে বের করা হয়। এ সময় তার হাতে একটি পানির বোতল রাখতে দেখা গেলেও কোনো হাতকড়া ছিল না। বেলা ১১টা ১৯ মিনিটে তাকে আদালতের এজলাসে আনা হয়। পরে মাথার হেলমেট খুলে তাকে কাঠগড়ার পাশে হুইল চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মামলার ফাইল দিয়ে তাকে কয়েকজন আইনজীবী বাতাস দিতে থাকেন। ১১টা ৪৭ মিনিটে তার জন্য স্ট্যান্ড ফ্যানের ব্যবস্থা করা হয়। তবে শুনানি না করেই পুলিশ প্রহরায় তাকে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। বেলা ৩টার পর ফের তাকে হুইল চেয়ারে আদালতে ওঠানো হয়। তার উপস্থিতিতে গ্রেপ্তার দেখানোর শুনানি শুরু হয়।
শুনানিতে প্রথমে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী গ্রেপ্তার দেখানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, ‘খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় দিয়েছেন। এজন্য শেখ হাসিনা তাকে পুরস্কার হিসেবে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান করেছিলেন। তবে এই পুরস্কার তার জন্য ছোট হয়েছে, আরও বড় হওয়া উচিত ছিল। এই মামলায় তদন্ত করতে অনেককে গ্রেপ্তার করেছেন। এই প্রক্রিয়ায় খায়রুল হকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততা পেয়েছেন। তাই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রার্থনা করছি।’
এরপর আসামিপক্ষে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান, আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহিন গ্রেপ্তার দেখানোর বিরোধিতা করে বলেন, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্যে এমন কিছু নেই, যে কারণে গ্রেপ্তার দেখানো যাবে। এই মামলায় তিনি এজাহারনামীয় আসামি নন। এই মামলার ঘটনার সময় হচ্ছে বেলা ১১টা। আবার আদাবর থানার আরেকটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেই মামলারও ঘটনা হচ্ছে বেলা ১১টা। একই সময়ে তো একজন ব্যক্তি দুই জায়গায় থাকতে পারেন না। সাবেক এ বিচারপতির বয়স ৮১ বছর, তিনি এই বয়সে আন্দোলন দমাতে রাস্তায় নামতে পারেন না। তিনি সব সময় পুলিশ পাহারায় থাকতেন। তাহলে কীভাবে এমন ঘটনা ঘটাতে পারেন। অর্থাৎ কোনোভাবেই ঘটনার সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন।’
বিচারক দুই পক্ষের শুনানি শেষে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন খোবাইব (২০)। যাত্রাবাড়ী ওভারব্রিজের নিচে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করার সময় মামলার আসামিদের নির্দেশে ও মদদে পুলিশ, র্যাবসহ অঙ্গসংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের অস্ত্রধারীরা আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে খোবাইব ঘটনাস্থলে মারা যান।
ওই ঘটনায় নিহতের ভাই জোবায়ের আহম্মেদ বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর মামলাটি করেন। এতে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, ওবায়দুল কাদেরসহ ৮০ জনকে আসামি করা হয়।
এর আগে, গত ১৭ মে আসামি হিসেবে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে গ্রেপ্তার না দেখাতে ও হয়রানি না করতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
পৃথক পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও আদাবর থানার পৃথক দুটি হত্যা মামলায় গত ৩০ মার্চ খায়রুল হককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে ১৩ মে রিট করেন খায়রুল হকের ছেলে আইনজীবী আশিক উল হক।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৪ জুলাই বিচারপতি খায়রুল হককে রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।


