রাজধানীর পুরান ঢাকার ধোলাইখাল। ট্রাক আর রিকশার ভিড়, দমবন্ধ করা যানজট, দিনভর ভাঙা লোহালক্করের স্তূপের মাঝে হাতুড়ি পেটা ও লোহাকাটা মেশিনের কানফাটা শব্দ, চারপাশে উড়ন্ত ধুলাবালি যেন এখানকার চিরচেনা রূপ। এই ধোলাইখালেই আছে রাস্তার একটি মোড়, যার নাম ‘লোহার পুল’।
বর্তমান সময়ে চারিদিকে লোহালক্করের এই ভিড়ে কেউ যদি খাল কিংবা লোহার তৈরি সেতু খুঁজে ফেরেন, সেটি হবে এক নিষ্ঠুর কৌতুক।
অথচ চার শতাব্দী আগে এই ধোলাইখালই ছিল প্রাচীন ঢাকার জীবনরেখা, শহরের সুরক্ষার প্রধান প্রতিরক্ষা প্রাচীর। এর ওপর বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ‘লোহারপুল’, যা ছিল এই শহরের ইতিহাসের প্রথম ঝুলন্ত সেতু।
স্মৃতিময় সেতু
নাম হিসেবে ‘লোহারপুল’ টিকে থাকলেও বর্তমান প্রজন্মের বাসিন্দারা কখনো এই সেতুটি চোখে দেখেনি।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলাম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘আমি আমার বাবার কাছে এই লোহারপুলের গল্প শুনেছি। শুনেছি ব্রিটিশ আমলেও নাকি এই সেতুর নিচ দিয়ে বড় বড় নৌকা চলাচল করত।’
নজরুল ইসলাম তার যৌবনে সেতুটিকে জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখেছিলেন। তিনি উল্লেখ করে জানান, স্বাধীনতার পর রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং কালভার্ট নির্মাণের জন্য এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হয়।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখনকার নতুন প্রজন্ম বিশ্বাসই করতে চায় না যে, এই রাস্তার নিচে একটি আস্ত বড় খাল চাপা পড়ে আছে, কিংবা এখানে একসময় একটি ঝুলন্ত সেতু ছিল।’
ইসলাম খানের দূরদর্শী খাল
ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ১৬০৮ থেকে ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ঢাকার প্রথম সুবেদার ইসলাম খান এই খাল খননের উদ্যোগ নেন।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, এই খালটি দুটি প্রধান উদ্দেশ্যে খনন করা হয়েছিল। প্রথমত, মগবাজার-তেজগাঁও অঞ্চলসহ পুরো শহরকে বহিরাগত আক্রমণকারীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এটি পরিখা হিসেবে কাজ করত। দ্বিতীয়ত, এটি শহরের অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগ রক্ষা করত এবং জলাবদ্ধতা প্রতিরোধ করত।
খালটি বালু নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে ডেমরার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এরপর ঢাকার বুক চিরে দক্ষিণ-পশ্চিমে মিল ব্যারাকে বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে গিয়ে মিশেছিল।
এই খালটি প্রধান দুটি শাখায় বিভক্ত ছিল। প্রথম শাখাটি পুরান ঢাকার প্রধান আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। এটি স্পর্শ করেছিল ফরাশগঞ্জ, সূত্রাপুর, নারিন্দা, মৈশুণ্ডি ও ধোলাইখাল। বর্ষাকালে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য এই শাখাটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ।
ফরাসগঞ্জ ও নারিন্দার ব্যবসায়ীরা বুড়িগঙ্গা নদী থেকে সরাসরি শহরে মালামাল আনার জন্য বড় বড় নৌকা ব্যবহার করতেন। এই অংশের ওপরেই ছিল ঐতিহাসিক লোহারপুল, যা সূত্রাপুর ও ফরাশগঞ্জকে সংযুক্ত করেছিল।
দ্বিতীয় শাখাটি পশ্চিম দিকে মোড় নিয়ে তৎকালীন শাহবাগ এলাকার পাশ দিয়ে ঢাকা-তেজগাঁও হয়ে কাওরান বাজারের দিকে চলে গিয়েছিল। বিখ্যাত ‘অ্যাম্বার ব্রিজ’ একসময় এই শাখার ওপর নির্মিত হয়েছিল, যা শাহবাগ ও কাওরান বাজারকে যুক্ত করেছিল।
ঐতিহাসিক যতীন্দ্রমোহন রায় তার ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে এই খালের গতিপথ বর্ণনা করেছেন। তিনি বালু নদী থেকে ফরিদাবাদের কাছে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত এর প্রবাহের কথা উল্লেখ করেন।
উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু
বহু বছর ধরে পুরান ঢাকার অর্থনীতি ও উৎসব এই ধোলাইখালকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো। বর্ষাকালে এই খালের দৃশ্য ছিল দেখার মতো। ফরাশগঞ্জ, নারিন্দা ও মৈশুণ্ডির হিন্দু ভক্তরা এই জলপথ দিয়ে নৌকায় করে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে পূজা দিতে যেতেন।
এমনকি ১৯৫০-এর দশকেও এখানে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হতো, খালের দুই তীরে বসত মেলা। স্থানীয় যুবকদের সাঁতার কাটা ও জলক্রীড়ার জন্য এটি ছিল এক আদর্শ জায়গা। সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা ঘোষ জগন্নাথ চন্দ্র স্মৃতি চারণ করে বলেন, ‘আমাদের শৈশবে এই খালের পানি ছিল একদম পরিষ্কার।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্ষার দিনে চারপাশের পরিবেশ দেখতে খুব সুন্দর লাগত। আমি লোহারপুল থেকে টারজানের মতো ছেলেদের খালে লাফিয়ে পড়তে দেখেছি।’
তিনি জানান, উত্তরের একটি পুরোনো কাঠের সেতু দুর্বলতার কারণে একসময় মানুষের মনে করুণার উদ্রেক করত। তবে বর্তমানের এই ধুলাবালি ও যানজটে ভরা ধোলাইখালকে এখন আর চেনার কোনো উপায় নেই।
ঢাকার প্রথম ঝুলন্ত সেতু
খাল খননের প্রায় দুই শতাব্দী পর, ১৮৩২ সালে ঢাকার তৎকালীন ব্রিটিশ কালেক্টর ও ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াল্টার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সূত্রাপুর-ফরাশগঞ্জ এলাকায় ধোলাইখালের ওপর একটি চমৎকার ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
ঐতিহাসিক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ গ্রন্থে এই দূরদর্শী প্রকল্পের কথা তুলে ধরেছেন।
একক স্প্যানের এই চেইন-লিংক ঝুলন্ত সেতুর সমস্ত উপাদান ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে করে আনা হয়। চারটি স্তম্ভের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা এই আধুনিক সেতুটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল প্রায় দুই বছর।
এটি বাসিন্দাদের কাছে এতটাই আশ্চর্যের বিষয় ছিল, স্থানীয়ভাবে একটি ছড়া প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল— ‘ওয়াল্টার সাহেবনে পুল বানায়া; উন কা নিচে গঞ্জ বসায়া’ (ওয়াল্টার সাহেব সেতু বানালেন এবং তার নিচে বাজার বসালেন)।
১৮৬৪ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি বা পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর, ১৮৬৭ সাল থেকে খালে চলাচলকারী বড় মালবাহী নৌকা ও যানবাহনের ওপর টোল বা কর আরোপ করা হয়।
১৮৬৭ থেকে ১৮৭২ সালের মধ্যে বার্ষিক গড় টোল আদায়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ হাজার টাকা, যা ছিল সেই আমলের জন্য বিশাল অংক। পরবর্তীতে পৌরসভা এই টোল আদায়ের দায়িত্ব পুরোপুরি নিজের কাঁধে তুলে নেয়।
একটি জীবনরেখার পতন
উনিশ শতকের শেষের দিকে ধোলাইখালের পতন শুরু হয়। শুষ্ক মৌসুমে মানুষ ঘরবাড়ি তৈরির জন্য খালের পাড় দখল করতে শুরু করে। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়।
সবশেষে ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তান আমলে ভূমিগ্রাসীদের চাপে খালটি সংকুচিত হতে থাকলে এর চূড়ান্ত বিপর্যয় নেমে আসে।
সময়ের নিষ্ঠুর আবর্তে লোহারপুলও নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। ২৫ ফুট দীর্ঘ এবং ১৯ ফুট চওড়া এই সেতুটি ব্রিটিশরা শেষবারের মতো ১৯৩৫ সালে সংস্কার করেছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এর রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ হয়ে যায় এবং একপর্যায়ে কাঠামোটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
আজ সেই জায়গার ওপর পিচঢালা রাস্তা তৈরি হয়েছে, নিচে চাপা পড়ে আছে বক্স কালভার্ট। জহির রায়হান নাট্যকেন্দ্রের কাছে কেবি রোড এলাকায় যেখানে একসময় সেতুটি ছিল, সেখানে এখন কোনো জলপথ বা ঝুলন্ত সেতু থাকার সামান্যতম চিহ্নও অবশিষ্ট নেই।
শুধু নামেই ইতিহাস
আজকের ধোলাইখালকে একটি ‘মৃত শহর’ হিসেবে বর্ণনা করা যায়, যেখানে খালের অবশিষ্ট অংশ এখন কেবল শহরের বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
খালের পানির সুবাস এখন পোড়া ইঞ্জিন অয়েল আর সিসার গন্ধে রূপ নিয়েছে। বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে খালের সেই প্রাণচাঞ্চল্য এবং সেতুর অস্তিত্ব।
এত কিছুর হারানোর পরেও টিকে আছে দুটি নাম–‘ধোলাইখাল’ এবং ‘লোহারপুল’। কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া একটি বিলুপ্ত জলজ সভ্যতার শেষ দীর্ঘশ্বাস জাগানিয়া স্মারক হিসেবে এই নামগুলোর মাঝেই আজও বেঁচে আছে ইতিহাস।


