নরসিংদীতে ধর্ষণের অভিযোগে ডাকা সালিসে টাকার বিনিময়ে মীমাংসার প্রস্তাব ওঠায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এক কিশোরী (১৭)। ভুক্তভোগী এখন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
শুক্রবার বিকালে সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের এ ঘটনা ঘটে।
কিশোরীর বাড়ি চিনিশপুর ইউনিয়নের একটি এলাকায়। এক মাস আগে পার্শ্ববর্তী শিবপুর উপজেলায় বিয়ে হয়েছিল তার। ১৫ দিন আগে বিয়ের কথা বলে নাইম (২৫) নামে এক তরুণ তাকে স্বামীর বাড়ি থেকে তুলে আনেন। নাইম একই এলাকার শফিকুল ইসলাম ও হেলেনা বেগমের ছেলে ও পেশায় প্রাইভেট কারচালক।
কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এক বছর ধরে নাইমের সঙ্গে ওই কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এক মাস আগে মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দেন তারা। গত ১০ মে এক বন্ধুর সহায়তায় স্বামীর বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে আসেন নাইম। এ ঘটনায় স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কয়েক দফা ধর্ষণ করেন।
এ ঘটনা এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর দ্রুত নাইমকে বিয়ে করতে চাপ দেন। কিন্তু তিনি এখন বিয়ে করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে এড়িয়ে চলছেন। মেয়ের স্বামী-সংসার থেকে বিচ্ছিন্নের পর ওই ছেলে বিয়ে করতে না চাওয়ায় বিপাকে পড়েন পরিবার। এ ঘটনায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং এলাকাবাসীর সহযোগিতা চান। পরে এ নিয়ে গত শুক্রবার বিকালে বসা এক সালিসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় ঘটনাটি মীমাংসার কথা আলোচনা হয়।
ওই সালিসে বিয়ের সিদ্ধান্ত না দিয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় মীমাংসার আলোচনা মেনে নিতে পারেনি ওই কিশোরী। তিনি বাড়িতে গিয়ে ঘরের দরজা আটকে গলায় ফাঁস নেন। ওই সময় তার পরিবারের সদস্যরা ঘরের দরজা ভেঙে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধারের পর দ্রুত তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেন। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ঢাকায় পাঠান চিকিৎসক। বর্তমানে তিনি বেসরকারি ওই হাসপাতালের আইসিইউতে অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
ভুক্তভোগীর মা বলেন, ‘বিয়ের কথা বলে নাইম মেয়ের সংসার ভেঙেছে, কয়েকদফা ধর্ষণ করেছে। এতকিছুর পর এখন তাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে না। সালিসে বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে টাকার বিনিময়ে মীমাংসার কথা ওঠায় সহ্য করতে পারেনি মেয়ে। পরে অপমান সইতে না পেরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। হাসপাতালের বেডে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে এখন।’
নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ফরিদা গুলশানারা কবির জানান, গলায় ফাঁস নেওয়া একজন কিশোরীকে শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে অচেতন অবস্থায় আমাদের হাসপাতালে আনা হয়। তার শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ঢাকায় পাঠানো হয়।
সালিসে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাজহারুল হক টিটু, ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও চিনিশপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আওলাদ হোসেন মোল্লা, বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেনসহ স্থানীয় ব্যক্তিরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওলাদ হোসেন বলেন, ‘উভয় পক্ষের অনুরোধে সেখানে গিয়েছিলাম। ওই সালিসে সবাই বিয়ের পক্ষে মত দিই। কিন্তু ছেলেপক্ষের লোকজন টাকা দিয়ে মীমাংসার কথা বলছিল। এর মধ্যে সালিস শেষ হওয়ার আগে মেয়ে বাড়িতে গিয়ে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। ঘটনার পর থেকে হাসপাতালে মেয়েটির পাশে অবস্থান করছি।’
নরসিংদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ আর এম আল মামুন বলেন, ‘অন্যত্র বিয়ে হওয়ার ১৫ দিন পর ওই মেয়েকে বিয়ের প্রলোভনে স্বামীর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল প্রেমের সম্পর্কে থাকা তরুণ। তবে এখন আর তাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না তিনি। এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টার মধ্যে ওই কিশোরী আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। ঘটনাটি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল, কিন্তু লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


