দেশে সাংগঠনিক তৎপরতার চেয়ে দৃশ্যত ‘বিদেশ ভ্রমণেই বেশি ব্যস্ত’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। দলটির শীর্ষ নেতারা গত একমাসে অন্তত তিন দেশ সফর করেছেন। এখনো একটি প্রতিনিধি দল রয়েছেন জাপান সফরে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, আত্মপ্রকাশের ছয় মাসেও দলটি কমপক্ষে ২৬টির বেশি জেলা এবং অর্ধেকের বেশি উপজেলায় এখনো কমিটি গঠন করতে পারেনি। মাঝে-মধ্যে ‘উঠান বৈঠক’ করলেও প্রায় গত দেড় মাসে তাদের ছিল না তেমন কোনো রাজপথের কর্মসূচি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ হয় এনসিপি’র। দলটির বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির যোদ্ধা ছিলেন। তরুণদের নেতৃত্বাধীন দলটি নিয়ে মানুষের মাঝে এক ধরণের প্রত্যাশা ছিল। ভিন্ন ধারার রাজনীতি আর নতুন বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল এনসিপির। কিন্তু শুরুর পর থেকেই দলটির নেতারা ব্যাপক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড শুরু করে সমালোচনায় পড়েন।
ছাত্রভিত্তিক রাজনীতি করলেও এনসিপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) পর দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের হারার পর দলটি এসেছে ফের আলোচনায়। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের মতো আগামী সংসদ নির্বাচনেও দলটির একই অবস্থা হবে কিনা, তা নিয়েও রয়েছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনেকে এনসিপিকে নিয়ে প্রোপাগাণ্ড (প্রচার-প্রচারণা) ছড়াতে পছন্দ করেন। হয়তো অনেক ক্ষেত্রে আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেছি। ভুল থেকে সংশোধিত হয়ে সামনে এগোচ্ছে দল।’
নেতাদের বিদেশ ভ্রমণের বিষয় প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘দলের নেতাদের বিদেশ সফর বা অনিয়মের বিষয়টি “ট্যাগিং” করার চেষ্টা আছে। কিন্তু দল ও অঙ্গ সংগঠনের কর্মসূচিও অব্যাহত রয়েছে। এতো কম সময়ে সবকিছু পরিপূর্ণ করা আসলেই সম্ভব?’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এনসিপির কাছে বেশি প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তারা শুরুতেই ভিন্নপথে চলে গেছে। এটি তাদের অভিজ্ঞাতার ঘাটতি। ভাল কিছু করতে না পারলেও তারা একেবারে ব্যর্থ সেটি আমি বলছি না।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান
এই বিশ্লেষক আরো বলেন, ‘তবে নতুন ধারার রাজনীতির যে প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছিল, তারা সেটি নিয়ে থাকলে ভাল করতে পারতো। কিন্তু দলটির অনেকে এখন সে পথে নেই। তারা জাতীয় নির্বাচন দলটি কেমন করবে, তা এখনই বলা কঠিন।’
এনসিপি’র রাজনৈতিক কর্মসূচি
সবশেষ দলটি গত ১ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত দেশব্যাপী পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করে। ৩ আগস্ট নতুন বাংলাদেশ গড়তে ইশতেহার ঘোষণা করে তারা। ব্যাপক প্রচারণা চালালেও ‘শো ডাউনের প্রত্যাশার’ বদলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ইশতেহার ঘোষণার কর্মসূচিতে উপস্থিতি ছিল খুব কম।
এছাড়া ২৯ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গণপরিষদ নির্বাচন, নতুন সংবিধান, বিচার ও সংস্কারের দাবিতে ‘উঠান বৈঠক’ কর্মসূচিতে তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি তারা।
এছাড়া মাঝেমধ্যে সভা-সেমিনারে কিছু তৎপরতা দেখিয়েছে এনসিপি।
দলীয় সূত্র বলছে, দলটির ১৪টি সেল ও ১০টি উইং রয়েছে। জেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে ৩৮ বা ৪০ টি। উপজেলা পর্যায়ে ২১০টি এবং মহানগরে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চত করেছেন দলটির যুগ্ম-সদস্য (দপ্তর) সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলার কমিটি গঠনের কাজ অব্যাহত। মাত্র ছয় মাসে চাইলেও সব কমিটি সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়।’

বিদেশ সফরে নেতারা
গত একমাসে তিনবার বিদেশ সফর করেছেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা। এখনো জাপান সফরে রয়েছেন দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুউদ্দীন পাটওয়ারী এবং যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মাহবুব আলম।
গত ১১ সেপ্টেম্বর জাপান সফরে যান তারা। এনসিপির ‘জাপান ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স’ এবং সেখানকার প্রবাসীদের আমন্ত্রণে তাদের এই সফর বলে জানিয়েছে দলটি।
এর আগে তিন দিনের সফরে গত ২২ আগস্ট মালয়েশিয়া যায় এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল।
সেখান থেকে ফিরে ২৬ আগস্ট চার দিনের জন্য চীন সফরে যান নেতারা। ওই দুই সফরেই নেতৃত্ব দেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
এনসিপির যুগ্ম-মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহীন বলেন, ‘বিদেশে প্রায় এক কোটি ভোটার। তাদেরকে নিয়ে নেতারা কাজ করছেন। অনেক দলের নেতারা বিদেশ গেলেও এনসিপি নেতাদের নিয়ে আলোচনা সৎ উদ্দেশে।’

ডাকসু ও জাকসুতে বাগছাসের ‘ভরাডুবি’
ছাত্রভিত্তিক রাজনীতি করলেও এনসিপির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনে ‘ভরাডুবি’র পর দলটি এখন ফের আলোচনায়। ডাকসু নির্বাচনে হতাশাজনক ফলাফল করেছে বাগছাস সমর্থিত প্যানেল।
ডাকসুর ২৮টি পদের একটিতেও তারা জিততে পারেনি। এমনকি ভোটের হিসেবে ভিপি, জিএসের অবস্থান ছিল পঞ্চম স্থানে। তবে হল সংসদে তুলনামূলক ভালো করেছে সংগঠনটি। সেখানে ছাত্রশিবিরের পর তাদের অবস্থান।
অন্যদিকে জাকসুর ফলেও আসেনি প্রত্যাশিত সাফল্য। জাকসুতে ২৫ পদের মধ্যে সমাজসেবা সম্পাদক পদসহ দুটি পদে জয় লাভ করে বাগছাস সমর্থিত প্যানেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে হতাশা থেকে সংগঠন পুনর্গঠনের কথা চিন্তা করছে বাগছাস।
অবশ্য এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছাত্র সংগঠনের কাছে যত প্রত্যাশা ছিল সেটি পূরণ হয়নি। তবে, “করুণ পরিণতি” হয়েছে এটা সঠিক নয়। তবে, জাকসুর ভিপি আমাদের সংগঠনের সাবেক নেতা। ডাকসুতে ছাত্রশিবিরের পরেই বাগছাসের অবস্থান।’
বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না এনসিপির
রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর শুরু থেকেই এনসিপির শীর্ষ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ বা সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তাদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের ‘বাণিজ্য ও অনিয়মের’ অভিযোগে পত্রিকার শিরোনাম হয় একের পর। কখনো তারা প্রাইভেটকার বা মোটরসাইকেল ‘শো ডাউন’ দিয়েও এসেছেন আলোচনায়। অনেকে হঠাৎ করেই অনেকের বিলাসবহুল জীবনযাপনও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এছাড়া দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা ‘চাঁদাবাজির’ অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হন। ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গ’, ‘চাঁদাবাজী’ ও ‘বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে’ জড়িয়ে কতজন নেতা বহিস্কৃত হয়েছেন, তার সঠিক তথ্যও নেই দলের যুগ্ম-সদস্য (দপ্তর) সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাতের কাছে।
তবে গত দুই মাসে নানা অভিযোগে ১৮ জনের বেশি নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।


