সারা দেশে আবহাওয়া এখন আর স্বাভাবিক গ্রীষ্মকালের মতো নেই। চারপাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, সবাই যেন কোনো এক অদৃশ্য চুল্লির ভেতর বাস করছে। সকাল হতেই চারপাশ গুমোট হয়ে ওঠে, দুপুরে রোদের তাপে বাইরে বের হওয়াই দায়, আর সূর্য ডোবার পরও কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি মিলছে না। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ—সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন: এ বছরের গরম কেন এত অসহ্য?
আবহাওয়া ও নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দমবন্ধ করা গরমের পেছনে কোনো একটি একক কারণ নেই, বরং একসঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেকগুলো কারণ। বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতা, কংক্রিটের ভবন ও পিচঢালা রাস্তা থেকে তাপ বের হওয়া, গতিহীন বাতাস, শহরের ভেতরের তাপমাত্রা চারপাশের চেয়ে বেড়ে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে গাছপালা ও জলাশয় দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া—সব মিলে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তার ওপর ঠিকমতো বৃষ্টি না হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দিন ও রাত উভয় সময়ের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সাধারণত ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ছিল। তবে বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা আর আটকে থাকা গরমের কারণে শহরের মানুষের কাছে এই তাপমাত্রা ৪২ থেকে ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো অসহ্য মনে হয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানী আতিক রহমান বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘চরম তাপ সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গরম বাড়ার মূলে বৈশ্বিক উষ্ণতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গরমকে কেবল একটি ঋতুর স্বাভাবিক রূপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্যানেলের (আইপিসিসি) ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে, শিল্পায়নের আগের যুগের তুলনায় ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.০৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। আর এর জন্য দায়ী মানুষের তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাস। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে গরম বছর এবং ২০২৫ সালও ছিল উষ্ণতম বছরগুলোর অন্যতম।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়েই এখন ঘন ঘন, তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ হচ্ছে, যার বড় ভুক্তভোগী বাংলাদেশ।
ঢাকায় গরমের বড় কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার পাশাপাশি ঢাকার এই চরম গরমের পেছনে বড় দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ণ। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, পিচঢালা রাস্তা আর কংক্রিটের ভবনগুলো দিনে তাপ শুষে নেয় এবং রাতে তা ধীরে ধীরে ছাড়ে। একই সঙ্গে, গাদাগাদি করে বহুতল ভবন তোলায় বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে গরম বাতাস বের হতে পারে না এবং দিনের পর দিন তাপ জমতেই থাকে।
২০২৪ সালের একটি গবেষণা দেখাচ্ছে, ১৯৯৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ঢাকার তাপমাত্রা প্রতি দশকে গড়ে ০.২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বেড়েছে। গবেষণায় বলা হয়, তীব্র গরমের সঙ্গে যখন শহরের নিজস্ব এই তাপ আটকে থাকার প্রক্রিয়া যোগ হয়, তখন রাতেও তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেশি থাকে। এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ।
কমছে সবুজ ও জলাশয়
অধ্যাপক আশরাফ এম দেওয়ানের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকার ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আর তা হয়েছে ফসলি জমি, খোলা জায়গা ও জলাভূমি ভরাট করে। বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের খাল, পুকুর ও জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় ঢাকার প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছে। গাছপালা থাকা এলাকার চেয়ে কংক্রিটে ঢাকা এলাকাগুলো ৪ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি গরম হতে পারে, যা মানুষের কষ্ট অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাতাসে আর্দ্রতা ও যন্ত্রের তাপ
আবহাওয়ার তথ্য বলছে, বর্ষার সময়ে ঢাকায় বাতাসে আর্দ্রতা সাধারণত ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশ থাকে, যা রাতে কখনো কখনো ৯০ শতাংশও ছাড়িয়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে জানিয়েছে, অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে বাতাসে এমন আর্দ্রতা থাকলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এর বাইরে গাড়ি, কলকারখানা, জেনারেটর ও এসি থেকে বের হওয়া কৃত্রিম তাপও শহরকে উত্তপ্ত করছে। বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় ২০ লাখের বেশি নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে। ফলে রাতের বেলাতেও শহরের তাপমাত্রা সহজে কমতে চায় না।
ভবিষ্যৎ ও বাঁচার উপায়
পরিবেশবিদ আতিক রহমান বলেন, এই তাপপ্রবাহ এখন আর কেবল পরিবেশের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরে ঢাকায় আরও ভয়ংকর ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা দেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু রাস্তাঘাট বা উড়ালসড়ক বানালে হবে না, নগর পরিকল্পনায় গরম কমানোর বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য শহরের ভেতরে গাছপালার সারি তৈরি, ছাদবাগান বা ছাদ সাদা রাখা, তাপনিরোধী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং জলাশয়গুলোকে কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে। এসব পদক্ষেপ না নিলে ঢাকার গরম আরও বাড়বে এবং গ্রীষ্মকালে এই শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।


