শীতের কুয়াশা কেটে যাওয়ার পর প্রথম রোদের উষ্ণতায় প্রতি বছর মাগুরার বড়রিয়া গ্রামে তিন দিনের ঘোড়দৌড় মেলা বসে। এই মেলা ঘিরে মাগুরার গ্রামটিতে এখন উৎসবের আমেজ।
প্রতিবারের মতো এ বছরও বাংলা ২৮ পৌষের ঐতিহ্য ধরেই এই আনন্দযজ্ঞের প্রথম ঢাক বেজে উঠেছে। মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের বড়রিয়া গ্রামে সোমবার থেকে শুরু হয়েছে দেড়শ বছরের পুরোনো এই ঘোড়দৌড় ও গ্রামীণ মেলা।
এদিন দুপুরে বড়রিয়া মাঠে শুরু হচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত ঘোড়দৌড়। এ সময় মাঠের চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। এই দৌড় দেখবে বলে একদিকে শিশুরা যেমন কৌতূহলী দৃষ্টিতে মুখিয়ে থাকে, অন্যদিকে অনেক বৃদ্ধ এই ঘোড়দৌড় দেখে নিজেদের বহু বছরের স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসে।

এ সময় তাদের মধ্যে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ছুটে চলা ঘোড়ার টগবগ শব্দে মিশে যায় মানুষের করতালি আর উল্লাস। এই ঘোড়দৌড় যেন কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি বড়রিয়া গ্রামের মানুষের আত্মার স্পন্দন। আর এ মেলা কেবল বিনোদন নয় বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে সব মানুষের মিলনের এক মহাযজ্ঞ।
এই মেলার বিস্তৃতিও চোখে পড়ার মতো। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সারি সারি দোকান। কোথাও রঙিন খেলনা, কোথাও মিষ্টির পাহাড়, কোথাও মাছ আর খাবারের সম্ভার। আবার কোথাও দোলনা, নাগরদোলা, শিশুদের রাইড। সব মিলিয়ে চারদিকের হাসি-আনন্দে বোঝা যায় এ মেলা শুধু কেনা-বেচার জায়গা নয়, এটি মানুষের হৃদয়ের মিলনমেলা।
মেলার দ্বিতীয় দিনে সেখানে আরেক আনন্দ আয়োজন হয়। একে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় জামাই মেলা। মূলত ওই দিনে এলাকার জামাইয়েরা শ্বশুর বাড়িতে আসেন। মিষ্টি আর বড় বড় মাছ কিনতে এদিন মেলায় রীতিমতো হুলুস্থুল বেধে যায়। বড় মাছ আর বালিশ মিষ্টি কেনায় মেতে ওঠেন জামাইয়েরা। কার জামাই কত বড় মাছ কিনল এই নিয়ে চলে নীরব প্রতিযোগিতা। এটি এখন ওই এলাকার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি শাহজাহান সরদার বলেন, ‘প্রায় দেড়শ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষ শানু সরদার, ধনাউল্লাহ সরদার ও সোনাউল্লা সরদার এই ঐতিহ্যের সূচনা করেন। তখন গ্রাম্য কাঁচা রাস্তায় হতো ঘোড়দৌড়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় ইটের সোলিং ও পাকা পথ তৈরি হলে দৌড় স্থানান্তরিত হয় গ্রামের মাঠে। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা আর আগ্রহ কখনো কমেনি, বরং বছর বছর তা বেড়েছে। আশপাশের গ্রামগুলোও মেলাটিকে নিজেদের করে নিয়েছে, ফলে আজ এটি শুধু বড়রিয়ার নয়, পুরো অঞ্চলের উৎসবে পরিণত হয়েছে।’

মেলায় দোকানিদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। মাগুরা জেলার নানা উপজেলা ছাড়াও নড়াইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, বাগেরহাটসহ বহু জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন। কেউ এনেছেন কাঠের ফার্নিচার, কেউ ঘর সাজানোর জিনিস, কেউবা বাহারি পোশাক ও খেলনা।
শাহজাহান সরদার আশা করছেন, এ বছর মেলায় কমপক্ষে ১০ কোটি টাকার বেচাকেনা হবে। এতে বোঝা যায়, বড়রিয়া মেলা শুধু সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ঘোড়দৌড় হলো এই মেলার প্রাণ। গত বছর আশপাশের ছয়টি জেলা থেকে ১৯টি ঘোড়া এই মেলায় অংশ নিয়েছিল।

এ বছর সেই সংখ্যা ২০ ছাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ঘোড়দৌড় ঘিরে, প্রতিটি ঘোড়ার সঙ্গে মালিকের স্বপ্ন, জকিদের দক্ষতা আর দর্শকদের উত্তেজনা যেন মিলেমিশে জড়িয়ে থাকে। দৌড় শুরু হওয়ার আগে পুরো মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তারপর ঘোড়ার দৌড়ের গতিতে সব নিরবতা ভেঙে যায়।
তিন দিনব্যাপী এই গ্রামীণ মেলা বড়রিয়া গ্রামকে এক অন্যরকম রূপ দেয়। দিনভর কেনাবেচা, সন্ধ্যায় আলোর ঝলকানি, রাতের হাওয়ায় ভেসে আসা ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দের সাথে হাজারো মানুষের বাড়ি ফেরার গল্প মিলেমিশে যায়। সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এখানে আসে, স্মৃতি জমা করে, আবার ফিরে যায়।
বড়রিয়া গ্রামের এই মেলা তাই শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি সময়কে ছুঁয়ে থাকা এক জীবন্ত ঐতিহ্য। যেখানে অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের উচ্ছ্বাস আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন একসঙ্গে মিশে যায়। তিন দিনের এই উৎসব শেষে মাঠ হয়তো আবার নীরব হবে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে বড়রিয়া মেলার রেশ থেকে যাবে আরও অনেক দিন।


