ভোটের মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি থাকলেও বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অনেকটাই ‘উৎসবহীন’ হতে চলেছে। চারটি নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও বড় দলগুলো নির্বাচনে বাইরে থাকায় সমর্থকদের বড় একটি অংশ ভোট বিমুখ হওয়ায় যার অন্যতম কারণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দল ভোট বর্জন করলে সমর্থকদের কেউ কেউ ভোট দিতে গেলেও তাদের মধ্যে নির্বাচনী আমেজ থাকে না। এ ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকায় তাদের মাঝে ভোট উৎসব নেই।
অনুসন্ধান বলছে, ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ, যার মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দলটি। ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের অধীনে ‘নিয়ন্ত্রিত’নির্বাচন করায় বিএনপি ও জামায়াত জোট দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোট বর্জন করছিল। ফলে, এই দুটি নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
মাঝে ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলা কারারুদ্ধ করার পর অনেকটাই নিরুপায় হয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সেটিও করলেও ‘রাতের ভোটের’খেতাব পায়।
আর ২০২৪ সালে আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগ সামিয়ক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় দলটি এবার ভোটের বাইরে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জনেরও ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। দলটির নেতাকর্মীরা মবের শিকারের পাশাপাশি গুম-খুনের মামলার আসামি।
১৯৯১ সাল থেকে চারটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোটের তথ্য অনুযায়ী বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ভোট প্রায় সমান, উভয় দলেরই ৩৭ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির ভোট প্রায় সমান, ৮ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো কোনো বড় দল নির্বাচনে না থাকলে ভোটেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই, তাই অন্তত ৩৫ শতাংশ ভোটার ভোট উৎসবেও নেই।
এসব দল ভোট বর্জন করলেও অনেক সময় সীমিত সংখ্যক সমর্থক ব্যক্তিগত বা নানা কারণে ভোট দিতে যায়। তবে তাদের উপস্থিতি নির্বাচনী আমেজ তৈরিতে কোনো প্রভাব রাখে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘যখন সব বড় দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ থাকে তখন একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। ভোটারদের মাঝে এক ধরনের উত্তেজনাও থাকে। কোন দল ক্ষমতায় আসবে তা নিয়ে তাদের মধ্যে ভাবনাও কাজ করে। কিন্তু বড় দলের অনুপস্থিতি থাকলে তেমনটা হয় না।’
তিনি বলেন, ভোটাররা যদি বুঝতে পারেন যে একটি দলের ক্ষমতায় আসাটা নিশ্চিত হয়ে গেছে তাহলে আর ভোট নিয়ে তেমন আগ্রহ থাকে না। আগের কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের অনুপস্থিতি যেমন প্রভাব পড়েছিল, এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় তেমন প্রভাব তো পড়বে।
চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের কুমিরা ঘাট এলাকায় যাত্রী, শিপব্রেকিং শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ভিড়ে নির্বাচনের সময় উৎসবমুখর তৈরি হয়। কিন্তু সেখানে এবার একেবারে ভিন্ন চিত্র। সাধারণ ভোটারদের অনেকেই নিরাপত্তা নিয়েও বেশ শঙ্কিত। তাদের অনেকেই এবার ভোটকেন্দ্রে যেতে চান না।
উত্তরের জেলা গাইবান্ধার চিত্রও একই রকম। সদর উপজেলা নিয়ে গাইবান্ধা-২ আসনে তেমন কোনো নির্বাচনী উৎসব নেই। অতীতে বিএনপি ও জামায়াতের ভোট বর্জনের সময়ও এখানে নির্বাচনী আমেজ ছিল না।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা টাইমসকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের কোনো অবনতি না হলেও নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা তৎপরতা আরো বাড়ানোর প্রয়োজন। কিন্তু আমরা তার ঘাটতি দেখছি। পতিত সরকারের লোকজন এখানে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। সেটি মোকাবিলা এবং ভোটারদের মাঝে ভীতিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে প্রশাসনরেক আরও তৎপর হতে হবে।’
এদিকে, সরকার ও নির্বাচন কমিশন বলছে, অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে এবার সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ইসি বেশ সন্তুষ্ট। তবে, আওয়ামী লীগ ভোটের বাইরে থাকায় এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াত উভয় জোট আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে পরস্পর ইসিতে একের পর এক অভিযোগ অব্যাহত রেখেছে।
যশোর ও সাতক্ষীরাসহ একাধিক এলাকার ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসি যাই বলুক না কেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সন্তোষজনক নয়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের কাউকে এখন বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীরা তোয়াক্কা করছেন না। ফলে, সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে ফের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

