ঢাকার অদৃশ্য সাম্রাজ্যে ফিরছে ভয়ংকর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা

ঢাকার অদৃশ্য সাম্রাজ্যে ফিরছে ভয়ংকর শীর্ষ সন্ত্রাসীরা
Advertisement
Advertisement

রাজধানী ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধ জগতে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। বাড়িয়ে দিয়েছে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ। দীর্ঘ সময় ধরে নিশ্চুপ থাকা বেশ কয়েকজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী পুনরায় আবির্ভূত হয়েছে। তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটেছে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা।

পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং অপরাধী চক্রের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার বেশ কিছু সন্ত্রাসী বর্তমানে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ প্রায় দুই দশক পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অনেক সন্ত্রাসী বিদেশে অবস্থান করলেও অন্যরা দেশের ভেতরেই আত্মগোপন করে আছে। তারা প্রকাশ্যে না এলেও চাঁদাবাজির টাকায় দেশে এবং বিদেশে সপরিবারে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছে।

গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীতে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডের পর সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। হত্যাকাণ্ডের চার দিন পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সন্দেহভাজন শুটারকে শনাক্ত করতে ডিবি পুলিশ ও র‍্যাবের তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছেন। পুরান ঢাকায় মামুন হত্যার পর নিউ মার্কেট এলাকায় টিটন হত্যার ঘটনাটি মূলত আধিপত্য বিস্তারের লড়াই বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো শনাক্ত করতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এবং র‍্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা অভিযান শুরু করেছে।

পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ধরণগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং এগুলো অপরাধ জগতের সমন্বিত সংঘাতের ফল।

মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা ব্যক্তিরা কিভাবে দেশ ও বিদেশ থেকে অনায়াসেই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিচ্ছে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন একজন সমাজবিজ্ঞানী। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে পুলিশি অভিযান এবং গোয়েন্দা তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সারোয়ার শনিবার টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে। তারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আগেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আড়াল ও বিদেশ থেকে পরিচালিত নেটওয়ার্ক

আন্ডারওয়ার্ল্ড অপরাধ জগতের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূল হোতারা দূর থেকেই তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের হাতে রয়েছে আধুনিক ছোট আগ্নেয়াস্ত্র। তারা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করছে।

আরও পড়ুন

শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টি বর্তমানে দুবাই থেকে মগবাজার, মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, গুলশান ও মতিঝিল এলাকার চাঁদাবাজি এবং ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে হারিছ আহমেদ ও তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ফিনল্যান্ডে থাকলেও মোহাম্মদপুর ও হাজারীবাগ এলাকায় তাদের প্রভাব বজায় রেখেছে।

টোকাই সাগর নামে পরিচিত আমিন রসুল সাগর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সম্প্রতি তিনি দেশ সফরের সময় স্থানীয় অপরাধী চক্রের সাথে নতুন করে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। জাফর আহমেদ মানিক ও ইমাম হোসেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যাতায়াত করেন এবং সেখান থেকেই মহাখালী, খিলগাঁও ও মতিঝিলের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন।

প্রকাশ কুমার বিশ্বাস ও তার ভাই বিকাশ কুমার বিশ্বাস বর্তমানে ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তবে বিকাশ নিয়মিত মিরপুর, পল্লবী ও কাফরুল এলাকার অপরাধীদের সাথে যোগাযোগ রাখেন এবং নতুন অপরাধীদের দিকনির্দেশনা দেন। সানজিদুল ইসলাম ইমন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কম্বোডিয়ার পাসপোর্ট ব্যবহার করে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপনের দেওয়া তথ্যমতে, ইমন বর্তমানে ব্রাজিলে সপরিবারে বসবাস করছেন।

ভারতে অবস্থানরত আরমান মালিবাগ-মগবাজার এলাকায় একটি সক্রিয় গ্যাং পরিচালনা করছেন। শামীম আহমেদ ওরফে আগা শামীমও ভারতে রয়েছেন, তবে তার নামে বনানী ও গুলশান এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি চলছে। ফোর স্টার গ্রুপের সদস্য মামুন ও শাহাদাত বর্তমানে মালয়েশিয়া থেকে মিরপুর, পল্লবী ও কাফরুল এলাকার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বলে জানা গেছে।

খন্দকার তানভীর ইসলাম জয় ভারত থেকে দুবাই হয়ে বর্তমানে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে যাতায়াত করছেন। দুবাইয়ে তার একটি কসমেটিকস ব্যবসা রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। কিলার আব্বাস মালয়েশিয়া থেকে কাফরুল, কচুক্ষেত ও ইব্রাহিমপুর এলাকার ঠিকাদারি ব্যবসা দেখাশোনা করছেন।

সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়াদের মধ্যে সুইডেন আসলাম থাইল্যান্ড থেকে ফিরে তেজগাঁও, পান্থপথ ও কারওয়ান বাজার এলাকায় সক্রিয় হয়েছেন। পিচ্চি হেলাল হিসেবে পরিচিত ইমামুল হাসান বর্তমানে দেশে থেকে মোহাম্মদপুর এলাকার ইজারা ও ঠিকাদারি কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসু কলাবাগান ও রমনা এলাকায় তার সহযোগীদের মাধ্যমে প্রভাব বজায় রেখেছেন।

ডিবির প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, দেশি ও বিদেশি উভয় পর্যায়ের অপরাধীদের ধরার চেষ্টা চলছে। বিদেশে বা দেশের ভেতরে যারা সক্রিয় আছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

রক্তের দাগ: তিন মাসে ৬১টি হত্যাকাণ্ড

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে রাজধানীতে ৬১টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি এবং মার্চ মাসে ২৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এপ্রিল মাসের প্রথম ২৮ দিনেই অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এই তিন মাসে সারাদেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন মোট ৮৫৪ জন।

বেশ কিছু আলোচিত ঘটনা আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সংঘাতের বিষয়টি প্রমাণ করে। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রায়েরবাজার বেড়িবাঁধে নাসির ও মুন্না নামের দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলালসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি রাতে নিউ এলিফ্যান্ট রোডের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে কুপিয়ে জখম করা হয়, যেখানে ইমন ও পিচ্চি হেলাল একে অপরকে দোষারোপ করেছিলেন।

২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার আদালতের সামনে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, ইমনের নির্দেশেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর আগে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মামুনকে লক্ষ্য করে চালানো এক হামলায় তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেসের কাছে আইনজীবী ভুবন চন্দ্র শীল নিহত হন।

২০২৫ সালের মে মাসে বাড্ডায় ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসা এবং চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কামরুল আহসান সাধন নামের একজন নিহত হন। এছাড়া মিরপুরে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া এবং কারওয়ান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোসাব্বির হত্যাকাণ্ডের সাথেও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা খুব কমই প্রকাশ্যে আসে। তবে আড়াল থেকে ঠিকই সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে তারা।

তার মতে, পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হলে নিয়মিত পুলিশি অভিযান এবং তথ্যদাতার মাধ্যমে গোয়েন্দা ভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
কামরুজ্জামান খান
কামরুজ্জামান খান

Staff Reporter, Times of Bangladesh

সম্পর্কিত খবর