জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বাস ভাড়া বাড়াতে মালিকপক্ষের তোড়জোরের মধ্যে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে শুরু করেছেন।
পেট্রল ও অকটেনের দাম ১৬ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণার পর যাত্রীরা মোটরসাইকেলের ভাড়া ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি আদায়ের যাওয়ার তথ্য জানাচ্ছেন।
ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার নতুন যে দাম ঘোষণা করেছে, সেটি ২০২২ সালের ৬ আগস্টের দামের কাছাকাছি।
সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার অকটেনের দর লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা ও পেট্রল ১৩০ টাকা দাম নির্ধারণ হবে, যেটি বিএনপি সরকার ঠিক করেছে যথাক্রমে ১৪০ ও ১৩৫ টাকা।
চার বছর আগে তেলের এই দাম ঘোষণার পর আনুপাতিক হারে গণপরিবহন ভাড়া বাড়ানো হয়। অ্যাপে চলা বাহনের ভাড়াও বাড়ে সেভাবেই। এরপর ধাপে ধাপে তেলের দাম কমানো হলেও সেই ভাড়া আর কমেনি। আর এখন পেট্রল-অকটেনের দাম সেই দরের চেয়ে ৫ টাকা বেশি হওয়ার ভাড়া এত বেশি কেন বাড়বে, সেই প্রশ্ন উঠেছে যাত্রীর তরফে।
ঢাকার হাতিরপুলের বাসিন্দা মৌরি সুলতানা জানান, বাসা থেকে গুলশানের অফিসে যেতে সাধারণত ১২০ থকে ১৩০ টাকা ভাড়া দিতে হতো। তেলের দাম বাড়ার পর দুই দিন ধরে তাকে গুনতে হচ্ছে ২০০ টাকা।

গণপরিবহনে নিয়ম না মানার স্রোতের বাইরে নয় মোটরসাইকেল চালকরাও। সাধারণত অ্যাপের বদলে চুক্তিতেই যাত্রীদেরকে যেতে বাধ্য করেন তারা।
চালকদের একজন হাসিবুল ইসলাম, স্বীকার করেন, তেজগাঁও থেকে ওয়ারী পর্যন্ত যেখানে অ্যাপে ভাড়া দেখায় ১৫০ টাকার আশেপাশে, সেখানে তিনি নিচ্ছেন ২৫০ টাকা পর্যন্ত।
তার ভাষায়, ‘জ্বালানি সংকট আর দাম বাড়ার কারণে টিকে থাকতে আমাদের এটা করতেই হচ্ছে।’
এভাবে স্বল্প দূরত্বের ভাড়াও ৬০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার তথ্য মিলছে। জ্বালানি সংকটের কারণে পেট্রল পাম্পে যখন গাড়ির সারি, সেখানে সড়কে এখন অনেকটাই কম, তাই যাত্রীদের দরকষাকষির সুযোগও কমে এসেছে। বিশেষ করে অফিস সময় বা ব্যস্ত এলাকায় ভাড়া আরও বেশি চাওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা রহমত আলী সোমবার সকালে বাড্ডার গুদারাঘাট থেকে কাওরানবাজার যেতে ১৫০ টাকা প্রস্তাব করেও কোনো মোটর সাইকেল চালককে রাজি করাতে পারেননি।
তিনি বলেন, ‘কেউ ২০০, কেউ ২২০ টাকা দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ২০০ টাকাতেই যাই।’

পুরান ঢাকার শিক্ষার্থী নুরজাহান বলেন, ‘আগে বসিলা যেতে যেখানে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা লাগত, এখন সেখানে ১৭০ থেকে ২০০ টাকার কমে কোনো চালক যেতে চান না।’
হাজারীবাগের বাসিন্দা হাসান মাহমুদ বলেন, ‘যাতায়াত ভাড়া এভাবে বাড়তে থাকলে আমরা যাব কোথায়?’
শাহবাগ এলাকায় আব্দুস সোবহান নামে এক চালক বলেন, ‘সহজে তেল পাওয়া যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে যে তেল পাওয়া যায়, তা কয়েকটি ট্রিপেই শেষ হয়ে যায়। মাঝপথে বাইক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকে-তাই ভাড়া না বাড়িয়ে উপায় কী?’
মো. আনিস নামে এক চালকের দাবি বলেন, ১৪০–১৬০ টাকার ভাড়া ২০০ টাকায় গেলেও তাদের আগের মতো লাভ হয় না।
সেটি কেন?-এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তেল পাই না, ঠিকমতো ভাড়াই তো মারতে পারি না। আগে যেখানে দিনে অন্তত হাজার দেড়েক টাকা পেতাম, এখন তো সাত থেকে আটশ টাকা তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
অ্যাপে কিন্তু আগের হারেই ভাড়া আসছে। রাইড শেয়ারিং চালক সাদেকুল ইসলাম জানান, নতুনবাজার থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত অ্যাপে এখনো ১৭০ থেকে ১৮০ টাকাই দেখায়।

কিন্তু অ্যাপে মোটরসাইকেল পাওয়া যায় কমই। আর বিকল্প হিসেবে যদি কেউ সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করেন, তাকে খরচ আরও বেড়ে যায়, সময়ও লাগে বেশি। তাই বাড়তি ভাড়া মেনে নিয়েই যাত্রীরা মোটরসাইকেলে চড়েন।
আবার তেল সংকটের কারণে রাইড শেয়ারিং খাতে চালকের সংখ্যা কমে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে রোববার রাজধানীতে রাইড শেয়ারিং চালকরা ভাড়া বৃদ্ধি, কমিশন কমানো এবং নীতিমালার সংস্কারের দাবি তুলেছেন। তারা কিলোমিটার প্রতি ৩৫ টাকা ভাড়া এবং সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, মোটরসাইকেলে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দৈনিক যাতায়াত ব্যয় বাড়ছে, বিকল্প পরিবহন খুঁজতে হচ্ছে, আর সময় ও ভোগান্তি-দুটোই বাড়ছে নগরবাসীর জীবনে।’


