ডিপি ওয়ার্ল্ডের এনসিটি চুক্তি নিয়ে সতর্ক নতুন সরকার

ডিপি ওয়ার্ল্ডের এনসিটি চুক্তি নিয়ে সতর্ক নতুন সরকার
চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

আইনি বাধা কেটে গেলেও দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছে সরকার। জানা গেছে, কৌশলগত কারণেই বিদেশিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো টেন্ডার ছাড়াই এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার জন্য চুক্তি করে। এই চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলেও হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ সরকারের সিদ্ধান্তকে বৈধ বলে রায় দেয়।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার এই চুক্তি নিয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করতে ইচ্ছুক নয়। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বন্দর) ফিরোজ আহমেদ জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এনসিটি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়নি।

তিনি আরও জানান, আদালতের রায়ের পর এখন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার নতুন সিদ্ধান্ত নেবে। এর ফলে বিষয়টি এখন কেবল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি নীতিনির্ধারণী পর্যালোচনার পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পর্যালোচনার মূলে রয়েছে দক্ষতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্ন। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সম্পদের পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ বিদেশি হাতে না দিয়ে দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে একই মানের সেবা পাওয়া সম্ভব কি না, তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালে বন্দরটি রেকর্ড ৩.৪ মিলিয়ন টিইইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনার) হ্যান্ডলিং করে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো এনসিটি। পাঁচটি বার্থ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ এই টার্মিনালটি বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ সম্পন্ন করে। ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে এনসিটি রেকর্ড এক লাখ ২২ হাজার ৫১৭ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে, যেখানে সাধারণত এর মাসিক গড় থাকে প্রায় এক লাখ। বর্তমানে বন্দরে দৈনিক ৮ থেকে ৯ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়, যার বড় একটি অংশ এই টার্মিনাল দিয়ে সম্পন্ন হয়।

আদালত এনসিটি চুক্তি সংক্রান্ত রিট খারিজ করে দিলেও এই চুক্তি নিয়ে নীতিগত বিতর্ক শেষ হয়নি। জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার এখন সরকারের হাতে।

আরও পড়ুন

বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে এই টার্মিনাল হস্তান্তরের প্রস্তাবটি দীর্ঘকাল ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এই চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া গতি পায় এবং ঝুলে থাকা কারিগরি ও আর্থিক শর্তগুলো চূড়ান্ত করা হয়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি বর্তমানে মন্থর হয়ে পড়েছে।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কৌশলগত নীরবতা পালন করছে। এমনকি চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীরাও প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছেন।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রিসভার একজন সদস্য বলেন, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। এর সাথে জাতীয় স্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জড়িত। সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

বর্তমানে এনসিটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এই ব্যবস্থাই বহাল থাকবে। বন্দরের জট নিরসন এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের চাপ সামলাতে এনসিটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে বন্দরের সক্ষমতা ও বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারকরা ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো অভিজ্ঞ বিদেশি অপারেটরদের যুক্ত করার কথা ভাবেন। বিদেশিদের কাছে হস্তান্তরের সমর্থকদের মতে, এর ফলে উন্নত লজিস্টিক ব্যবস্থা এবং দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

তবে এর বিরোধিতাকারীরা জাতীয় সার্বভৌমত্ব, রাজস্ব ভাগাভাগি এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরশীলতার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। দেশীয় স্টেকহোল্ডারদের দাবি, সঠিক নীতি ও সহযোগিতা পেলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই বিশ্বমানের সেবা দিতে সক্ষম।

বর্তমানে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এনসিটির কার্যক্রমের সাথে যুক্ত সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন দাবি করেন, দেশীয় অপারেটররা ইতিমধ্যে জটিল লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় বছরে ১৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে প্রস্তাবিত ১৫ বছর মেয়াদী এবং বার্ষিক ১৫ লাখ টিইইউএস সক্ষমতার এই চুক্তিটি এখন এক গভীর দ্বন্দ্বে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার কি বিদেশি অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষতা নিশ্চিত করবে, নাকি দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শত কোটি ডলারের বাণিজ্য প্রবাহের এই টার্মিনাল নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তটি কেবল একটি চুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবকাঠামো পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad