রিয়েল টাইম লেনদেন পর্যবেক্ষণ, এআইভিত্তিক জালিয়াতি শনাক্তকরণ, বায়োমেট্রিক যাচাই ও জিওফেন্সিংয়ের উদ্যোগ ডিজিটাল আর্থিক অপরাধ, ভুয়া সিম ও জাল মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবের ব্যবহার ঠেকাতে নজরদারি আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এর অংশ হিসেবে রিয়েল টাইমে লেনদেন পর্যবেক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ, বায়োমেট্রিক পরিচয় যাচাই এবং লেনদেনের সঙ্গে গ্রাহকের অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সিম নিবন্ধনে কড়াকড়ি আরোপ, মৃত ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত সিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা, করপোরেট সিমের ব্যবহারকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা এবং ভুয়া এমএফএস হিসাব শনাক্তে কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
গত ১৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের সভার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা জানানো হয়। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), জাতীয় টেলিযোগাযোগ মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি), এমএফএস প্রতিষ্ঠানসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে যুক্ত করা হচ্ছে।
ডিজিটাল লেনদেনে অনিয়ম ও জালিয়াতি শনাক্তে এনটিএমসিকে রিয়েল টাইম ট্রানজেকশন মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় এআই ও মেশিন লার্নিংভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে জালিয়াতির ধরন, অর্থ পাচারের প্রবণতা এবং অস্বাভাবিক লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হবে।
কোন ব্যক্তি কখন এবং কোথা থেকে লেনদেন করেছেন, তা যাচাইয়ের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে। এ জন্য সন্দেহজনক লেনদেন যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সুবিধা যুক্ত করে সংশ্লিষ্ট অ্যাপ্লিকেশনগুলো হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে।
লেনদেনে যুক্ত হবে অবস্থান
ডিজিটাল লেনদেনের নজরদারিতে গ্রাহকের অবস্থান বা জিওলোকেশন তথ্য ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে গ্রাহকের রিয়েল টাইম অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে লেনদেনের সময় সংশ্লিষ্ট অ্যাপ চালু হলে জিওলোকেশন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), এনটিএমসি ও বিটিআরসির সহায়তায় এমএফএস এজেন্টদের জন্য জিওফেন্সিং ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্ধারিত এলাকার বাইরে কোনো এজেন্টের কার্যক্রম পরিচালনা সীমিত করা সম্ভব হবে।
বায়োমেট্রিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে এমএফএস হিসাব
এমএফএস হিসাব খোলার ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই আরও কঠোর করা হচ্ছে। বিটিআরসির সেন্ট্রাল বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম (সিবিভিএমপি) ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সাবস্ক্রাইবার ডেটা ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্ম দ্রুত চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিটিআরসির তথ্য ব্যবস্থার সহায়তায় এমএফএস গ্রাহকের এনআইডি ও মোবাইল নম্বর যাচাই করা হবে। এতে নতুন ও পুরোনো হিসাবের মধ্যে ভুয়া বা অবৈধ ব্যবহারকারী শনাক্ত করা সহজ হবে।
এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহক, এজেন্ট ও রিটেইলারদের ১০০ শতাংশ ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন, তথ্য হালনাগাদ এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনরায় যাচাই করতে হবে। নিয়ম ভঙ্গ করলে লাইসেন্সিং নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সব ধরনের লেনদেনে এসএমএসভিত্তিক ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপি ব্যবহারের নির্দেশনাও রয়েছে।
মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সিম বন্ধ হবে
সিম নিবন্ধনেও আসছে নতুন কড়াকড়ি। বিটিআরসির সিবিভিএমপিকে বৈধ পরিচয়পত্রের ডাটাবেজ এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্য ব্যবস্থার (বিডিআরআইএস) সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার ছয় মাস পর তার নামে নিবন্ধিত সিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয় করবে বিটিআরসি। ডিজিটাল মৃত্যু সনদের তথ্যও এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
সিম নিবন্ধনের সময় নেওয়া আঙুলের ছাপ ও মুখমণ্ডলের বায়োমেট্রিক তথ্য সরাসরি সিবিভিএমপির মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। মোবাইল অপারেটররা এসব তথ্য সাময়িকভাবেও সংরক্ষণ করতে পারবে না।
একটি বৈধ পরিচয়পত্রের বিপরীতে সব মোবাইল অপারেটর মিলিয়ে সর্বোচ্চ পাঁচটি সিম রাখার বিধান করার পরিকল্পনা রয়েছে। একটি সিম নিবন্ধনের পর পরবর্তী সিম নিবন্ধনের জন্য অন্তত সাত দিন অপেক্ষা করতে হবে।
দুইটির বেশি সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সিবিভিএমপি এবং পুলিশের ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে অতিরিক্ত যাচাই করতে হবে। সিম নবায়নের সময়ও নিয়মিত কেওয়াইসি যাচাই করা হবে।
করপোরেট সিমেও পরিচয় যাচাই
করপোরেট সিম ব্যবস্থাপনায়ও অভিন্ন নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, ট্রেড লাইসেন্স যাচাই, প্রকৃত ব্যবহারকারী শনাক্তকরণ এবং একটি প্রতিষ্ঠানের নামে কতটি করপোরেট সিম নেওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
প্রতিটি করপোরেট সিম সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর নাম, ঠিকানা ও এনআইডির সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং এসব তথ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে সংরক্ষণ করা হবে।
ভুয়া সিম শনাক্ত, অভিযোগ গ্রহণ এবং যাচাই শেষে প্রতারণামূলক সংযোগ বাতিলের জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এ কাজে পুলিশ, বিটিআরসি, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই), এনটিএমসি, বিশেষ শাখা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যুক্ত থাকবে।
ভুয়া এমএফএস হিসাব শনাক্তে কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম
ভুয়া এমএফএস হিসাব ও অবৈধ লেনদেন শনাক্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে পৃথক একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী, গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থাগুলো এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সন্দেহজনক হিসাব বা লেনদেনের তথ্য জানাতে পারবে। যাচাই শেষে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট এমএফএস হিসাব বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া মার্চেন্ট হিসাব ব্যবহার করে অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে বিএফআইইউয়ের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স কাজ করবে। একাধিক হিসাব ব্যবহার, অর্থের স্তরীকরণ বা লেয়ারিং এবং সন্দেহজনক লেনদেনের মতো কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করবে এই টাস্কফোর্স।
এজেন্ট পর্যায়ে অ্যাপভিত্তিক লেজার ব্যবস্থাপনা চালুর মাধ্যমে লেনদেন ও লেনদেনে যুক্ত ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এনআইডি নম্বর ও ছবি রাখার কথাও রয়েছে।
এমএফএস প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক ও লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও তদন্ত সংস্থার কাছে দ্রুত এবং আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে ব্যাংকার্স এভিডেন্স অ্যাক্ট, ২০২১ সংশোধনের প্রস্তাবও করা হয়েছে। সংশোধন হলে এনটিএমসির মাধ্যমে এসব তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। পরে এসব প্রতিবেদন আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটিতে উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।


