সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান একজন ‘সিরিয়াল কিলার’ একথা জানার পরেও কেন ব্যবস্থা নেননি, সেই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি টিটো।
জবাবে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘জিয়াউল আহসান সিরিয়াল কিলার, এ কথা জানার পরেও আমি লিখিত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করিনি। কারণ সে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম, খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা হয়েছে ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে। সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আগের দিন তিনি বলেছিলেন, জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার।
সোমবারও তার জেরা শেষ না হওয়ায় আগামী ১ মার্চ পরবর্তী জেরার দিন ধার্য করা হয়েছে।
জেরায় ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ও পারসোনাল সার্ভিসে জিয়াউল আহসান সিরিয়াল কিলার মর্মে উল্লেখ ছিল কি না, মনে নেই। জিয়া সিরিয়াল কিলার মর্মে সেনাবাহিনীর কোনো দপ্তরে কোনো রেকর্ডপত্রে উল্লেখ আছে কি না আমার মনে নেই।’
‘তবে আমি বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যগুলো লিখিত নয়।’
আইনজীবীর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘আমার সিনিয়র থাকলেও আমাকে সেনাপ্রধান করার ঘটনাকে আমি নিয়মের ব্যতয় মনে করি না। কারণ পদোন্নতির ক্ষেত্রে কেবল সিনিয়রিটি বিবেচ্য নয়।’
গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই সেনা প্রধানের নিয়ন্ত্রণে ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ডিজিএফআই প্রতিরক্ষা মন্ত্রাণালয়ের অধীনে ছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিন বাহিনীর সমন্বয়ে ডিজিএফআই পরিচালিত হয়। সামরিক অফিসাররা ডিজিএফআইয়ে প্রেষণে যোগদানের পর সেনাপ্রধানের নিয়ন্ত্রণে থাকেন না। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এমআই) সরাসরি সেনা প্রধানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে আমি সেনাপ্রধান থাকাকালীন সময় ব্যতয় ঘটেছে। জিয়াউল আহসানের প্রভাবে আমার ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুলকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যত্র পোস্টিং করা হয়েছে। তবে পোস্টিং এর তারিখ বলতে পারবো না। মাঝে মাঝে নিজের জন্ম তারিখও মনে থাকে না।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুলকে নৈতিক স্খলন জনিত কারণে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটি আমার জানা নেই। কারণ তার অবসর হয়েছে আমার অবসরে যাওয়ার পরে।’
২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে কোন বিষয়ে কোন তদন্তের নির্দেশ দেননি বলেও এক প্রশ্নের জবাবে জানান তিনি
কারণ হিসেবে বলেন, সে সময় তিনি সেনাপ্রধানের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলেন না।
ইকবাল করিম বলেন, ‘তাকে আমি সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার চেষ্টা করেছি কিন্তু আনা সম্ভব হয়নি। ’
এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি ইকবাল করিম ভূঁইয়া জেরায় জানান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার হওয়ায় তিনি তার পদোন্নতির পক্ষে ছিলেন না। তিনি বলেন, জিয়াউল আহসান কখনোই ভালো কর্মকর্তা ছিলেন না।
এর আগে ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি জবানবন্দি দেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ১৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল। ১০৪ জনকে হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করা হয়।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের মতে, ২০০৯-২০১৬ সময়কালে জিয়াউল আহসান র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক এবং এডিজি (অপস্) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময়ে অসংখ্য বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, অগণিত হত্যাকাণ্ড, গুমসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধে তার সরাসরি নির্দেশ, অনুমোদনক্রমে, জ্ঞাতসারে তার বিশ্বস্ত র্যাব সদস্যরা সংঘটন করত।
প্রসিকিউশন সূত্র মতে, ২০০৯ সালে সেনাবাহিনীর মেজর অবস্থায় র্যাবে পোস্টিং পাওয়ার পর থেকে আসামি জিয়াউল আহসান বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শেখ হাসিনার অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ফলে ২০২৪ সালে মেজর জেনারেল হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসরের আগ পর্যন্ত তাকে কখনোই মাতৃবাহিনী তথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফেরত যেতে হয়নি। শেখ হাসিনার পুরো আমলে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন বাহিনী বা সংস্থায় কাজ করেছেন। পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় কোর্স বা প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করে এবং কোনো ব্যাটালিয়ন, ব্রিগেড বা ফর্মেশন কমান্ডের অভিজ্ঞতা ছাড়াই আসামি জিয়াউল মেজর জেনারেল পর্যন্ত পদোন্নতি পান, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারত্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।


