ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসন বণ্টন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে টানাপোড়েনের সমাপ্তি হতে চলেছে। এই দুই দলের সংকট কেটে যাওয়ায় আসন সমঝোতায় গঠিত ১১ দলের আসন বিন্যাসও চূড়ান্ত হতে চলেছে। ফলে, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১ দলের আসন বণ্টনের চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে বুধবার দলগুলোর বিশেষ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলছেন, গত এক সপ্তাহে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তিন দফার বৈঠকে জোট বজায় রাখতে ইতিবাচক ফলাফল এসেছে। একটি সূত্র বলছে, ঘোষণার আগপর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীকে চাপে রাখতে চায় ইসলামী আন্দোলন।
আসন্ন সংসদ নির্বাচনে আসন সমঝোতায় কয়েক মাস আগে গঠিত হয় ৮ দলের মোর্চা। দলগুলো হচ্ছে- জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।
শেষ সময়ে এসে গত ২৮ ডিসেম্বর আরও তিনটি দল যুক্ত হয় এ জোটে। যার মধ্যে রয়েছে, অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লেবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জুলাই যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
মূলত পরের তিনটি দল যুক্ত হওয়ার পর আসন সমঝোতা নিয়ে বেশ জটিলতা সৃষ্টি হয় আট দলে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের টানাপোড়েন শুরু হয়, যা মেটাতে গত কয়েকদিনে দুই দলের শীর্ষ নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলের মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসলে খুব একটা টানাপোড়েন ছিল না। চাওয়া পাওয়া হিসাবের যে ব্যাপারটা ছিল তার বেশি কোনো সংকট তৈরি হয়নি। আমরা এবার দল দেখছি না। জয়ী হতে পারে এমন প্রার্থী যে দলেরই হোক তাকে গুরুত্ব দিচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাছাইয়ে অনেক প্রার্থী বাদ পড়ছেন, তাই আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত সময়ের বিষয়টি আমরা মাথায় রাখছি।’
দলগুলোর বিশেষ সূত্র বলছে, গত কয়েকদিনের বৈঠকে ১১ দলের আসন সমঝোতা প্রায় শেষ পর্যায়ে। অন্য কোনো দলের বিশেষ আপত্তি না থাকলে চরমোনাই পীর সৈয়দ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন আসন বণ্টন নিয়ে জামায়াতের ওপর বেশ নাখোশ হয়। তবে, শেষ পর্যন্ত জামায়াত ১৮৫ আসন, ইসলামী আন্দোলন ৪৮ আসন, এনসিপি ২৫ আসন, মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৪টি, আহমদ আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস ৬, জাগপা ১টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ১, খেলাফত আন্দোলন ২, নেজামে ইসলাম পার্টি ২, এলডিপি ৩টি এবং এবি পার্টিকে ৩টি আসনে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এই হিসাবে দলগুলো ২৯০ আসনে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করেছে। অবশিষ্ট ১০ আসনের মধ্যে অমুসলিম, বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রার্থী এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাখা হয়েছে। তারা বিশেষ কোনো দলের অন্তর্গত নন। তবে, শেষ পর্যন্ত কোনো কোনো দলের ক্ষেত্রে দুই একটি আসন বাড়তে বা কমতে পারে।
এই জোটের একজন নেতা বলছেন, অর্ধশতাধিক আসনে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের একটা ঝামেলা ছিল। সেসব আসনে একটি নিরপেক্ষ টিম দিয়ে জরিপ করা হয়েছে কাদের জনপ্রিয়তা বেশি। জরিপ অনুযায়ী প্রার্থী তালিকা ঠিক করা হচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আসন বণ্টন নিয়ে কিছুটা চ্যালেঞ্জে পড়তে হয়েছে। কয়েকটি আসন নিয়ে আমরা এখনো আলোচনা পর্যায়ে রেখেছি। আশা করছি, বুধবারের বৈঠকে সব সমাধান হয়ে যাবে। চূড়ান্ত ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত নানা অনিশ্চয়তা থাকে তাই আমরা দ্রুত ঘোষণা করার চেষ্টা করছি।’
জানা গেছে, জামায়াতসহ আট দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ পাঁচ দফা দাবিতে প্রায় তিন মাস যুগপৎ আন্দোলন করেছে। তারা এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে জোরালো ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে। ইসলামী দলগুলোর ভোট যেন ‘একবাক্সে’ পাঠানো যায় তা নিশ্চিত করতে এসব দল আগে থেকেই জোর দিয়ে এসেছে।
আটটি দলের মধ্যে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলার সক্ষমতা রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। দল দুটির আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন করায় আগামী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব পড়তে পারে। তবে, শেষ সময়ে এনসিপিকে জোটে নেওয়ার বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে জামায়াত ও সমমনাদের। জুলাই যোদ্ধাদের নেতৃত্বে গঠিত এনসিপি ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলার চেয়ে তরুণ শক্তিকে কাজে লাগানো ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদের এলডিপিকে কাছে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ইস্যুতে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে দলগুলো। গত ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময়ে দলগুলো আসন সমঝোতায় ব্যর্থ হওয়ায় ভিন্ন ভিন্নভাবে মনোনয়ন জমা দেয় এসব দলের প্রার্থীরা।
আগামী ২০ জানুয়ারি প্রার্থী প্রত্যাহারের শেষ দিন। এ সময়ের মধ্যে দলগুলোতে আসন সমঝোতা হলে আসন প্রতি একটি দলগুলোর একজন প্রার্থী থাকবেন। অন্যরা প্রত্যাহার করবেন।


