নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না শেষ পর্যন্ত জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগদান করছেন। দুই-একদিনের মধ্যে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে পারে বলে দুই দলেই জোরেসারে আলোচনা চলছে।
এনিয়ে মাহমুদুর রহমান মান্নাও সরাসরি কিছু না বললেও কৌশলী বক্তব্য দিচ্ছেন। ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, “আসলে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখন সমঝোতা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। তাই কে কখন কোনদিকে যাচ্ছে তা বলা কঠিন।”
জামায়াত জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “এখনো দলটির সঙ্গে এ বিষয়ে তেমন কথা হয়নি। হয়তো তারা (জামায়াত) নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে পারে।” জামায়াত জোটে যাওয়া নিয়ে ‘হাঁ’বা ‘না’ উত্তর এড়িয়ে তিনি বলেন, দেখা যাক।”
বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন থাকা সত্বেও আসন না পাওয়ায় দলটির প্রতি কোন ক্ষোভ আছে কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কিছু বলার নেই। আমরা রাজনীতি করি মানুষের জন্যে তারা বিচার করবেন।”
এর আগে বৃহস্পতিবার ঠাকুরগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম জানান, “ ১০ দলীয় জোট ফের ১১-দলীয় জোটে রুপান্তরিত হচ্ছে। দুই-একদিনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা আসবে।”
এরপর থেকে আলোচনা শুরু হয় আসলে কোন দল যোগ দিচ্ছে জামায়াত জোটে।
এমন প্রশ্নের উত্তর খূঁজতে গিয়ে টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধান বলছে, জামায়াত নেতারা ইতিমধ্যে মাহমুদুর রহমান মান্নাকে জোটে নেয়ার বিষয়ে সঙ্গে কয়েকদফা কথা বলেছেন। জামায়াতের পাশাপাশি মান্নারও এতে আগ্রহ রয়েছে। কারণ, মান্নাকে বগুড়া-২ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি সেখানে দলটির প্রার্থী শাহে আলমকে ‘ধানের শীষ’প্রতীক দিয়েছে। বিএনপির প্রার্থীকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়ায় তিনি এখন ক্ষুব্ধ। দুঃসময়ের ত্যাগ মূল্যায়ন না করায় তিনি ‘নাগরিক ঐক্য’এককভাবে ১১ টি আসনে দলের প্রতীক ‘কেটলি’প্রতীকে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিএনপি মান্নাকে সংসদ নির্বাচনের বদলে ক্ষমতায় গেলে ‘মন্ত্রীত্ব’ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তিনি এই প্রস্তাবে রাজি হননি।
জামায়াতের একটি সূত্র বলছে, “মাহমুদুর রহমান মান্না ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। জামায়াত তাকে ঢাকা-১৮ আসনে ছাড় দিতে চায়। তবে, মান্না উভয় আসনেই ভোট করতে চান। তিনি যেকোন একটি আসনে জেতার নিশ্চয়তা চান।
এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি আব্দুল হালিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নতুন করে কিছু বলতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি ঠাকুরগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছি।”
নাগরিক ঐক্যের একজন নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা মহানগরের সাবেক সহসভাপতি বলেন, “জামায়াত জোটে গিয়ে এমপি হতে না পারলে অবস্থান নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টির পাশাপাশি মান্নার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার আরো নিম্নমুখী হতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে তিনি চিন্তা ভাবনা করছেন। তবে, শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট করে ঢাকা-১৮ আসনে ভোট করার পক্ষে ইতিবাচক মান্না ও তার দল।”
সেক্ষেত্রে ওই আসনে জামায়াতের নেতৃত্বে দশ দলীয় জোটের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি) নেতা আরিফুল ইসলাম আদীব মান্নাকে সমর্থন দিয়ে ভোটের মাঠ ত্যাগ করতে পারেন।
মাহমুদুর রহমান মান্নার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার বেশ দীর্ঘ। জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ থেকে তিনি ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন।
পরে ১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৬ সালে জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি হন। ১৯৭৯ সালে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সালে তিনি বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ও পরে জাতীয় মুক্তি দল গঠন করেন। ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
এরপর নব্বই দশকে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হন। ২০০৭ সালের বহুল আলোচিত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পান। ফলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাকে আর মনোনয়ন দেয়নি।
আওয়ামী লীগ তাকে বহিষ্কার না করলেও এক পর্যায়ে তিনি নিজেই দল থেকে বের হয়ে এসে নাগরিক ঐক্য গঠন করেন। বর্তমানে তিনি এই দলের সভাপতি।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহমুদুর রহমান মান্না আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। প্রায় এক বছর আট মাস জেল খাটার পর তিনি মুক্তি পান।
তিনি ২০১৮ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ গ্রহণ করেছিলেন। ২০২২ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ছিলেন।


