এ এক ভিন্ন রকম লড়াই, ভিন্ন রকম অনুভূতি। মাঠে প্রতিপক্ষ নিজের জন্মভূমি। অথচ লড়তে হবে দাঁতে দাঁত চেপে। হয় মার, নয়তো মর। কারণ পরাজয়ে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই, সরাসরি বিদায়।
বলছি ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া সেই ফরাসি ফুটবলারদের কথা, যারা মরক্কোর হয়ে মাঠে নামবেন ফ্রান্সেরই বিপক্ষে। মরক্কোও তাদের দেশ, পূর্বপুরুষের জন্মভূমি। এখন তারা দুই দেশেরই নাগরিক। তবে ফুটবলের জন্য বেছে নিয়েছেন পূর্বপুরুষের দেশ। তাও একজন-দুজন নয়, ছয়জন।
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও মরক্কো। এই হাইভোল্টেজ ম্যাচকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সেই ভিন্ন রকম আবেগ।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে যে একাদশ নিয়ে মরক্কো বাজিমাত করেছিল, সেই একই স্কোয়াড যদি ফ্রান্সের বিপক্ষে মাঠে নামে, তবে মরক্কোর অন্তত তিনজন ফুটবলারকে লড়তে হবে তাদের নিজেদের জন্মভূমির বিরুদ্ধে। নিজের জন্মভূমির বিপক্ষে খেলার এই আবেগময় দোলাচলের সামনে দাঁড়িয়ে মরক্কো শিবিরের তিন ফরাসি সন্তান।
ফ্রান্সের ডিফেন্স ভাঙা কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পেদের আক্রমণ রোখার দায়িত্বে থাকবেন এই তিন ফুটবলার। সংখ্যাটা আরও বাড়তেও পারে, কারণ মরক্কোর বেঞ্চে আছেন আরও তিন ফরাসি।
ফ্রান্স ফুটবলের জন্য সবচেয়ে বড় আক্ষেপের নাম ১৮ বছর বয়সী মিডফিল্ডার আইয়ুব বোয়াদ্দি। মাত্র তিন মাস আগেও ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-২১ দলের অধিনায়ক ছিলেন লিল-এর এই বিস্ময়বালক। প্যারিসের কাছাকাছি জন্ম নেওয়া বোয়াদ্দি বিশ্বকাপের ঠিক আগে মরক্কো দলে যোগ দেন। এখন নিজের জন্মভূমির মাঝমাঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার ছক কষছেন এই গণিতের ছাত্র।
রক্ষণভাগের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ইসা দিওপ জন্মগ্রহণ করেছেন ফ্রান্সের তুলুজে। তিনিও ছিলেন ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলের নিয়মিত মুখ। ২০১৬ সালে এমবাপ্পের সাথে একই দলে খেলে ইউরো অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়ন হওয়া এই ফুটবলার মায়ের সূত্রে মরক্কোর নাগরিকত্ব পান। এখন ২৯ বছর বয়সী দিওপ মরক্কোর রক্ষণভাগের অন্যতম বড় ভরসা।
ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া আরেক মিডফিল্ডার নিল এল আয়নাউই মরক্কোর কিংবদন্তি টেনিস তারকা ইউনেস এল আয়নাউই-এর ছেলে। বাবার দেশের প্রতি ভালোবাসার টানেই ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পাশে সরিয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন মরক্কোর জার্সি।
মরক্কোর বর্তমান দলটি মূলত প্রবাসী মরক্কানদের উত্তরসূরিদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে মাত্র সাতজনের জন্ম মরক্কোয়। বাকি ১৯ জনের জন্ম বিদেশে, যার মধ্যে ১৮ জনই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন।
স্কোয়াডে জন্মদেশের হিসেবে সবচেয়ে বেশি ছয়জন করে ১২ জনের জন্ম স্পেন ও ফ্রান্সে। তিনজনের জন্ম বেলজিয়ামে, তিনজনের নেদারল্যান্ডসে এবং একজনের জন্ম কানাডায়।
ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ছয় ফুটবলার হলেন ইসা দিয়প, আয়ুব বুয়াদ্দি, নীল এল আইনাউই, আমিন আদলি, গেসিম ইয়াসিন এবং সোফিয়ান দিয়প। এদের প্রত্যেকেই ফরাসি জন্মসূত্রের পাশাপাশি পারিবারিক সূত্রে মরক্কোর নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী, তাই তারা সবাই দ্বৈত নাগরিক। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী তারা মরক্কোর হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মরক্কোর অধিকাংশ বিদেশে জন্ম নেওয়া ফুটবলারের গল্প প্রায় একই। তাদের বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদি উন্নত জীবনের আশায় কয়েক দশক আগে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সন্তানদের জন্ম হয়েছে ইউরোপে, বেড়ে উঠেছেন সেখানকার ফুটবল একাডেমিতে। কিন্তু পারিবারিক পরিচয়, সংস্কৃতি এবং শিকড় তাদের টেনে এনেছে মরক্কোর জার্সিতে।
বিশ্বকাপে এমন ঘটনা নতুন নয়। তবে মরক্কোর বর্তমান দলটি এই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে একাদশের ১১ জনই ছিলেন বিদেশে জন্ম নেওয়া—যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
ফ্রান্সের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল তাই শুধু একটি নকআউট ম্যাচ নয়। ইসা দিয়প, আয়ুব বুয়াদ্দি ও নীল এল আইনাউইয়ের কাছে এটি হবে আবেগ, পরিচয় এবং শিকড়ের এক অনন্য লড়াই। এক পাশে থাকবে জন্মভূমি, আর অন্য পাশে পূর্বপুরুষের দেশ। শেষ পর্যন্ত তারা খেলবেন সেই দেশের জন্য, যাকে তারা নিজেদের পরিচয়ের সবচেয়ে গভীর অংশ বলে মনে করেছেন—মরক্কো।


