‘জঙ্গল সলিমপুর আর কোনোভাবেই সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য থাকবে না’ বলে হুঁশিয়ার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। রোববার বেলা ১১টায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরের আলিনগর এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ্রিংয়ে এ হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘বিগত ১৭ বছরের ‘দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি’র মধ্য দিয়ে এখানে রাষ্ট্রের ভেতরে দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল। সেটার একটা নমুনা হচ্ছে এই জঙ্গল সলিমপুর।’
তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দেয়। কিছু ব্যবসায়ীর বাসায় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের ঘটনা আমরা গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল তাদের অভয়ারণ্য আগে ধ্বংস করতে হবে।’
মন্ত্রী জানান, গত ৯ মার্চ পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার ও কয়েকজন সন্ত্রাসী আটক হলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পুরোপুরি আসেনি মন্তব্য করেন তিনি বলেন, ‘কোনো না কোনোভাবে অভিযানের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তারা আগে থেকেই সতর্ক হয়ে গিয়েছিল’
‘এলাকাজুড়ে সন্ত্রাসীরা সিসিটিভি ক্যামেরা ও পাহারাদার বসিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অ্যালায়েন্স ঘোষণা করার মতো দুঃসাহস তারা কোথা থেকে পেয়েছে, কারা তাদের সহযোগিতা করেছে, কারা জমি দখলের সঙ্গে জড়িত- এসব আমরা খুঁজে বের করেছি’, যোগ করেন সালাউদ্দিন আহমেদ।
সম্প্রতি আলিনগরে যৌথ বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা, রাস্তা কেটে ফেলা এবং বুলডোজার দিয়ে স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অভিযান চলবে।’
জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী বাইপাস এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে নতুন সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনা তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।’

তবে এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষকে উচ্ছেদ করা হবে না বলে আশ্বাস দেন তিনি। সেইসঙ্গে যারা বিভিন্ন কারণে এখানে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছে, তাদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘কাউকেই আপাতত উচ্ছেদ করা হবে না। আমরা জনগণের সরকার, জনগণকে কমফোর্ট দেওয়ার জন্যই পরিকল্পনা করব।’
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর প্রকল্পের জন্য জঙ্গল সলিমপুরের খাসজমিতে জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জেলা প্রশাসন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
জঙ্গল সলিমপুরের পাশের বেতুয়া ও চা বাগান এলাকায়ও সন্ত্রাসীদের আনাগোনা রয়েছে এবং এসব এলাকাও সন্ত্রাসমুক্ত করার হুঁশিয়ারি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তবে সেটা হবে পরিকল্পিত সার্বিক ও যৌথ অভিযানের মাধ্যমে।’
দেশব্যাপী মাদক, সন্ত্রাস, জুয়া ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুরোনো আইন দিয়ে আধুনিক অনলাইন ও অফলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
‘মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। হাজার হাজার মাদকের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে’, যোগ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
কিশোর গ্যাং নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘কিশোর অপরাধীদের আইনি সুবিধার অপব্যবহার করে অনেকেই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। এ কারণে কিশোর অপরাধ দমনে আইন সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।’

দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভা শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়েও সন্ত্রাস দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ‘দেশে কার্যকরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক না কেন, তা সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে। রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস যে সব সন্ত্রাসী দেখিয়েছে, তাদের যথাযথভাবে দমন করা হবে।’


