জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান জকসু নির্বাচনে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা ও সহিংস আচরণের অভিযোগ তুলেছে শিবির সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেল’। এদিকে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে কালো টাকার ব্যবহার ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলেছে ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান প্যানেল’।
মঙ্গলবার সকালে আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম এবং ছাত্রশক্তির কিশোর অঞ্জন সাম্য তাদের প্যানেলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন।
শিবির সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘ভোটগ্রহণ শুরুর সময় পরিবেশ শান্ত থাকলেও পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ক্যাম্পাসের প্রধান গেটে ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।’
তার অভিযোগ, ছাত্রদলের কর্মীরা ভোটার স্লিপ বিতরণে বাধা দেন, শিবির সমর্থিত কর্মীদের হেনস্থা করেন এবং নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন। ছাত্রদলের পোলিং এজেন্টরা শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট প্যানেলে ভোট দিতে প্রভাবিত করছেন এবং শিবির প্যানেলের ভোটার স্লিপ জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ফিজিক্স, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইংরেজি বিভাগসহ একাধিক ভোটকেন্দ্রে ছাত্রদলের এজেন্টরা নির্বাচন বিধি লঙ্ঘন করে প্যানেল পরিচিতিসংবলিত বুকলেট নিয়ে অবস্থান করছিলেন। এসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে শিবিরের প্রার্থী ও ভোটারদের ওপর হামলার চেষ্টা করা হয়। ইংরেজি বিভাগে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।’
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন রিয়াজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে অভিযোগ জানানো হলেও নির্বাচন কমিশন বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত নয় বলে জানায় এবং কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’ এ সময় তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেন।
ভোট গণনার সময় বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি জানান, ক্যাম্পাসের আশপাশে বহিরাগত ও ক্যাডারদের অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে, যা নির্বাচনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আরও কঠোর অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করেন শিবিরের এই নেতা।
কালোটাকার ব্যবহার ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ ছাত্রশক্তির
এদিকে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে কালো টাকার ব্যবহার, পেশিশক্তি প্রদর্শন ও প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান প্যানেল’। মঙ্গলবার সকালে সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী কিশোর অঞ্জন সাম্য ও জিএস পদপ্রার্থী ফয়সাল মুরাদ।
কিশোর আনজুম সাম্য বলেন, ‘দীর্ঘ আন্দোলন ও লড়াইয়ের পর বহুল আকাঙ্ক্ষিত জকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এর সার্বিক পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের জন্য গভীর উদ্বেগের।’ নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র দেশবাসী ও শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জিএস প্রার্থী ফয়সাল মুরাদ অভিযোগ করেন, সকালে ক্যাম্পাসের বাইরে পরিকল্পিতভাবে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করা হয়েছে। কালো টাকার ব্যবহার ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে একটি পক্ষ ভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোট দেওয়ার পর ভোটারদের আঙুলে অমোচনীয় কালি ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে সেই কালি সহজেই মুছে যাচ্ছে। এতে ভোটের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’

অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সমর্থিত দুটি প্যানেলের বিপুলসংখ্যক বহিরাগত ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে এবং পর্যবেক্ষণ কার্ডের অপব্যবহার হয়েছে। এসব বিষয়ে কমিশন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’ ফয়সাল মুরাদ জানান, নির্ধারিত তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও তাদের একাধিক পোলিং এজেন্টকে কার্ড দেওয়া হয়নি এবং ভোট শুরুর দুই ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। অথচ পোলিং এজেন্ট কার্ড সরবরাহের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনেরই ছিল।
তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে কাগজ, স্লিপ বা টোকেন বহন নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও একটি প্যানেলের পোলিং এজেন্টদের হাতে ভোটার তালিকার উল্টো পাশে প্রার্থীদের নাম ও ব্যালট নম্বর লেখা কাগজ দেখা গেছে; যা সরাসরি আচরণবিধি লঙ্ঘন। এ ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনসিসির কিছু সদস্য বুথের সামনে জটলা করে নির্দিষ্ট প্যানেলের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে।’
শেষে ফয়সাল মুরাদ জানান, তারা নির্বাচনের বিরোধিতা করছেন না; বরং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চান। শিক্ষার্থীরা কালো টাকা, দুর্নীতি ও পেশিশক্তির বিরুদ্ধে রায় দেবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ’আমরা সেই ম্যান্ডেটের রায় নিয়েই ক্যাম্পাস ত্যাগ করব।’


