৩৫ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরেছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ইশতেহার ঘোষণা, পোস্টার, মাইকিং এবং হলভিত্তিক প্রচারণায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। কোনো প্রার্থী নিয়েছেন সেবামুখী কৌশল, কেউ মিছিল-মিটিংয়ের ওপর নির্ভর করে আছেন। আবার কেউ কেউ নীরবে শক্তি বাড়িয়ে চলেছেন।
কিন্তু শিক্ষার্থীদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একটিই প্রশ্ন। আর সেটি হলো–গত এক বছর ধরে কোন সংগঠন সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীবান্ধব ভূমিকা পালন করেছে এবং কার হাতে তারা তুলে দেবেন তাদের প্রতিনিধিত্বের অধিকার।
শিবিরের কৌশল
নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এরই মধ্যে বেশি কিছু কার্যক্রম চালিয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির, যার মধ্যে বছরের শুরুতেই ছিল নবীনবরণ এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইন প্রোগ্রাম। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার কাজটিও তারা করে চলেছে।
গত রমজানে শিবির টানা ২০ দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দুই হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ইফতারের আয়োজন করেছিল। এরপর ঈদুল আজহায় ক্যাম্পাসে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য তারা বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করে। পাশাপাশি চবি শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের দাতব্য কার্যক্রমও চালাচ্ছে তারা।
এ ছাড়া, ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম শহর থেকে চারুকলা ইনস্টিটিউটকে ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন শুরু করেছিল। তারা প্রকাশ্যে কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, শতভাগ আবাসন নিশ্চিত এবং সেশনজট নিরসনের দাবি জানিয়েছে।
মিছিল, মিটিং আর বিশৃঙ্খলায় ছাত্রদলের বছর পার
২০২৩ সালেল ১১ আগস্ট গঠন করা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটি। এক বছরের জন্য গঠিত ওই কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন ২০০৮-২০০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আলাউদ্দিন মহসিন। সাধারণ সম্পাদক করা হয় ২০০৯-২০১০ শিক্ষাবর্ষের আবদুল্লাহ আল নোমানকে। যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ এই কমিটিতে মোট পাঁচ জন নেতা ছিলেন।
এই সময়ে, কমিটির নেতারা বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত থাকায় দলকে সংগঠিত করতে ব্যর্থ হন। গত রমজানে ছাত্রদল একটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষার সময় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন এবং কয়েকটি হলে ওয়াইফাই সংযোগ দেওয়াসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তাও দিয়েছে তারা।
বাগছাসের ঘরেই বিভক্তি
জুলাই অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের (বাগছাস) আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন পায় গত বছরের ২৪ আগস্ট। তবে কমিটি ঘোষণার পর থেকে তাদের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সাংগঠনিক কার্যক্রম দেখা যায়নি।
যদিও বাগছাস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্যানেল দেয়নি, তবে এই সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন প্যানেল থেকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
বামপন্থীদের লক্ষ্য শিক্ষার্থী অধিকার
গত এক বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সক্রিয় ছিল। তবে তাদের বেশিরভাগ রাজনৈতিক বক্তব্যই ছিল শিবির ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
আবাসন সুবিধা, শাটল ট্রেনে নিরাপত্তা ও বগি বৃদ্ধি এবং ছাত্রীদের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে তাদের সংবাদ সম্মেলন, দেয়াল লিখন এবং লিফলেট বিতরণ করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী এবং বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি বামপন্থী সংগঠন মিলে ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ নামে একটি প্যানেল ঘোষণা করেছে।
এই প্যানেলের অধীনে গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের সভাপতি ধ্রুব বড়ুয়া ভিপি পদে, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক সুদর্শন চাকমা জিএস পদে এবং জাকিরুল ইসলাম জসিম সহকারী সাধারণ সম্পাদক এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাকসু নির্বাচনে ভোট গণনা, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। নির্বাচনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
দীর্ঘ ৩৫ বছরের অপেক্ষা
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে স্ক্যানার ব্যবহার করে ভোট গণনা করা হবে। এই পর্যায় থেকে ফলাফল তৈরির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি বিভাগও ভোট গণনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। এরপর উভয় খাতের ফলাফল মিলিয়ে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হবে।
সর্বশেষ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সালে। এরপর নির্বাচনের অপেক্ষায় কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৫ বছর। আগামী ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চাকসু ভোট।
এই নির্বাচনে কে জয়ী হবে, কার ঘরে যাবে আন্দোলন-মিছিলের ফসল তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র দুই-তিন দিন।


