চট্টগ্রামে এনসিপির কোন্দল এবার ৫ কোটির মামলায়

চট্টগ্রামে এনসিপির কোন্দল এবার ৫ কোটির মামলায়
Advertisement
Advertisement

পাঁচ তারকা হোটেলের রুফটপ বারের মদ্যপান, ধূমপান আর শ্লীলতাহানির অভিযোগ নিয়ে শুরু হওয়া নাটকীয়তা এবার আদালতপাড়ায় গড়াল। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন রূপ নিয়েছে প্রকাশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে।

দলটির মহানগর নেত্রী সাদিয়া আফরিন এবার অভিযোগকারী নারী কর্মী সানজিদা সুলতানা ইভা এবং দলের এক নেতার বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার পাল্টা মানহানি মামলা করেছেন।

রোববার চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাদিয়া আফরিন বাদী হয়ে এই সিআর মামলাটি করেন। এতে প্রধান বিবাদী করা হয়েছে দলটির নারী কর্মী সানজিদা সুলতানা ইভাকে। দ্বিতীয় বিবাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের সহসাংগঠনিক সম্পাদক ৩৫ বছর বয়সী হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদকে।

এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৮ থেকে ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে নেপথ্য থেকে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে এর তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দিয়েছেন।

মামলার বাদী সাদিয়া আফরিন তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, তিনি এনসিপির একজন সক্রিয় কর্মী এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা কমিশনার পদপ্রার্থী। বিবাদীরা পরস্পর যোগসাজশে তার দীর্ঘদিনের অর্জিত সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

সাদিয়া দাবি করেন, গত ১৪ জুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইভা যে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরবর্তীতে ১৯ জুন সংবাদ সম্মেলন করেছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তাকে এবং কেন্দ্রীয় নেতা এস এম সুজা উদ্দিনকে ফাঁসানোর জন্য এই নাটক সাজানো হয়েছে। এই অপপ্রচারের ফলে তার প্রায় ৫ কোটি টাকার মানহানি হয়েছে বলে তিনি মামলায় দাবি করেন।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ জুন নগরীর জিইসি এলাকার পাঁচ তারকা হোটেল পেনিনসুলায়। নারী কর্মী ইভার অভিযোগ ছিল, সাংগঠনিক আলোচনার কথা বলে সাদিয়া আফরিন তাকে হোটেলের রুফটপ বারে নিয়ে যান। সেখানে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সুজা উদ্দিনের উপস্থিতিতে তাকে মদ্যপান ও ধূমপানে প্ররোচিত করা হয়।

আরও পড়ুন

ইভার দাবি অনুযায়ী, এক পর্যায়ে সাদিয়া সেখান থেকে চলে গেলে সুজা উদ্দিন তাকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন এবং অশালীন প্রস্তাব দেন। তবে সাদিয়ার মামলায় এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং একে একটি পরিকল্পিত ফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভেতরের খবর ও সত্যতা যাচাইয়ে এনসিপি কেন্দ্রীয়ভাবে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ২৩ জুন এই কমিটির প্রধান সারজিস আলম, সদস্য আলী আহসান জুনাইদ এবং মনিরা শারমিন চট্টগ্রামে আসেন। তারা ভুক্তভোগী নারী এবং অভিযুক্তদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

এ বিষয়ে জানতে সারজিস আলমের নম্বরে ফোন দেওয়া হলে তিনি কেটে দেন। পরে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সাদিয়া আফরিন বারবার ইভাকে সুজা উদ্দিনের সঙ্গে একা রেখে নিচে নেমে যাচ্ছিলেন। এ ছাড়া, সুজা উদ্দিন ইভা হোটেল ত্যাগ করার পর তাকে কয়েকবার ফোন দিলেও তদন্ত কমিটির কাছে এর কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। অন্যদিকে, ইভা এবং তার সহযোগীরা সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের জন্য অর্থের বিনিময়ে প্রচারণা চালিয়েছেন বলেও পাল্টা অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে মামলার দ্বিতীয় বিবাদী হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন এবং সংবাদ সম্মেলনের সময় তিনি চট্টগ্রামেই ছিলেন না। তিনি কেবল মানবিক কারণে এবং ইভা তার শিক্ষার্থী হওয়ায় ফোন কলের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে চেয়েছিলেন। এটার কারণে তাকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করে হয়রানি করা হচ্ছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তা ছাড়া একজন নারীর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাশাপাশি ছবি সংযুক্ত করে আমার সম্মানহানি করা হয়েছে। আমি বর্তমানে চট্টগ্রাম আদালতে সুজা উদ্দিন, সাদিয়া আফরিন, আরিফ মঈনুদ্দিন এবং সাদিক আরমানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করছি, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এই ঘটনার রেশ ধরে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির শীর্ষ দুই নেতাকে শোকজ করা হয়েছে। তারা হলেন মহানগর আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব এবং সদস্য সচিব আরিফ মঈনুদ্দিন।

গত ২০ জুন কেন্দ্রীয় দপ্তর সেল থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আসার আগেই এই দুই নেতা অভিযুক্ত সুজা উদ্দিনের পক্ষ অবলম্বন করে বিবৃতি দিয়েছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে মামলাটি পিবিআইয়ের তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তকারীরা ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড এবং পেনিনসুলা হোটেলের বিলের কপি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করছেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad