বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই টানটান উত্তেজনা, আর সেই মঞ্চে যদি নাম থাকে ব্রাজিলের, তবে সমীকরণের পারদ চড়ে আকাশচুম্বী। চলতি বিশ্বকাপ ফুটবলের গ্রুপ পর্বের শেষ প্রান্তে এসে ঠিক তেমনই এক রোমাঞ্চকর দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে সেলেসাওরা। মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এখন তাদের ভাগ্য ঝুলে আছে দুটি ম্যাচের ওপর–নিজেদের মুখোমুখি লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড, আর অন্য প্রান্তে মরক্কো বনাম হাইতির দ্বৈরথ।
গ্রুপের এই টানটান উত্তেজনার নেপথ্যে রয়েছে দলগুলোর আগের দুটি ম্যাচের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও মরক্কো, যেখানে ১-১ গোলের সমতায় পয়েন্ট ভাগাভাগি করতে হয় তাদের। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে হাইতিকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শক্তি জানান দেয় সাম্বা জাদুকররা।
অন্যদিকে, মরক্কো তাদের দ্বিতীয় ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ গোলের কষ্টার্জিত জয় তুলে নেয়। এর ফলে দুই ম্যাচ শেষে ব্রাজিল ও মরক্কো উভয়ের সংগ্রহেই রয়েছে সমান ৪ পয়েন্ট। তবে গোল পার্থক্যে এগিয়ে রয়েছে সেলেসাওরা; ৪ গোল দিয়ে ১ গোল হজম করায় ব্রাজিলের গোল পার্থক্য এখন +৩। বিপরীতে ২ গোল দিয়ে ১ গোল হজম করা মরক্কোর গোল পার্থক্য +১, যার কারণে টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থেকে তারা ব্রাজিলের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে।
ওদিকে হাইতিকে ১-০ গোলে হারিয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে আছে স্কটল্যান্ড। এক গোল দিয়ে এক গোল হজম করা স্কটল্যান্ডের গোল পার্থক্য শূন্য।
গ্রুপের শীর্ষস্থান ধরে রেখে পরের রাউন্ডে যাওয়ার চাবিকাঠি অবশ্য এখনো ব্রাজিলের নিজেদের হাতেই রয়েছে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে যদি তারা বড় জয় তুলে নিতে পারে, তবে অন্য মাঠের ফলাফলের দিকে না তাকিয়েই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউটে পা রাখবে পাঁচবারের বিশ্বজয়ীরা।
তবে ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা, আর এখানেই যত হিসাব-নিকাশের মারপ্যাঁচ। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে যদি ন্যূনতম গোলের জয় পায় আর মরক্কো বিশাল বড় ব্যবধানে হাইতিকে হারায়, তবে গোল ব্যবধানে ব্রাজিলকে টপকে মরক্কো গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারে। ব্রাজিলকে তখন সন্তুষ্ট থাকতে হবে গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে। স্কটল্যান্ডের সঙ্গে পা পিছলে ড্র আর হাইতির সঙ্গে মরক্কোর ন্যূনতম জয়েও অবস্থা হবে একই রকম।
সবচেয়ে নাটকীয় এবং উদ্বেগের সমীকরণটি লুকিয়ে আছে ব্রাজিলের সম্ভাব্য পরাজয় এবং তৃতীয় হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে। স্কটিশদের কাছে যদি ব্রাজিল হেরে যায় এবং অন্য ম্যাচে মরক্কো যদি হাইতিকে অনায়াসে হারিয়ে দেয়, তবে দ্বিতীয় স্থানে চলে যাবে স্কটল্যান্ড। আর ব্রাজিল নেমে যেতে যাবে গ্রুপের তৃতীয় স্থানে।
চলতি বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী সেরা আট তৃতীয় স্থান অধিকারী দলের একটি হয়ে ব্রাজিলের পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ হয়তো থাকবে, কিন্তু সেই পথটি হবে ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল। অন্য গ্রুপের ফলাফলের ওপর তখন চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হবে নেইমার-ভিনিসিয়াসদের। কারণ ব্রাজিলকে ছাড়াই অন্যসব গ্রুপ থেকেও তৃতীয় স্থানের সেরা আট নির্ধারণ হয়ে যেতে পারে!
ব্রাজিল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ‘এফ’ গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানের দল। সে ক্ষেত্রে জাপান কিংবা সুইডেন হতে পারে তাদের প্রতিপক্ষ। অবশ্য ‘এফ’ গ্রুপের নাটকীয় কোনো অঘটনে নেদারল্যান্ডসও হয়ে যেতে পারে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ। আর ব্রাজিল যদি গ্রুপে দ্বিতীয় হয়, সেক্ষেত্রে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ‘এফ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন, যেখানে এগিয়ে আছে নেদারল্যান্ডস।
ব্রাজিল যদি সেরা তৃতীয় হয়ে পরের পর্বে যায়, তাহলে আরও কঠিন হয়ে ওঠতে পারে তাদের যাত্রা। সেক্ষেত্রে তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হবে জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা মেক্সিকো, যেখানে একচুল ভুলেই শেষ হয়ে যেতে পারে হেক্সা জয়ের স্বপ্ন। অবশ্য মেক্সিকো প্রতিপক্ষ হলে কিঞ্চিৎ স্বস্তি পেতে পারে ব্রাজিল।
সব মিলিয়ে, স্কটল্যান্ড আর হাইতি-মরক্কো ম্যাচের ফলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের গতিপথ। সাম্বা ঝড়ে স্কটল্যান্ড উড়ে যাবে নাকি সমীকরণের বেড়াজালে আটকে যাবে ব্রাজিল, তা দেখার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে কোটি ফুটবল অনুরাগী।


