ইটের দেয়াল, ব্ল্যাকবোর্ড আর ঘণ্টার শব্দে ঘেরা একটা বিদ্যাপীঠ। যেখানে একদিকে শিক্ষকদের ব্যস্ততা, অন্যদিকে শত শত শিশুর বাঁধভাঙা চঞ্চলতা। এই চেনা কোলাহলের ভিড়ে যে মানুষটি বছরের পর বছর কোনো প্রতিদানের আশা না করে এক চিলতে শীতল ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি শেফালি বেগম। কাগজে-কলমে তার পদবি ‘স্কুল আয়া’। কিন্তু তিনি ছিলেন পুরো স্কুলের পরম মমতাময়ী ‘শেফালি খালা’।
দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর (১ম) উচ্চ বিদ্যালয়ে চাকরির পর এলো সেই অমোঘ বিদায়ের মুহূর্ত। তবে শেফালি খালার বিদায়বেলা সাধারণ কোনো বিদায় ছিল না। কোনো উচ্চপদস্থ আমলা বা পরম শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষকের বিদায়ও হয়তো এতটা আবেগঘন হয় না, যতটা অশ্রুসিক্ত বেদনায় ভারী হয়ে উঠেছিল ফতেপুর স্কুলের আঙিনা।
যে মানুষটি চার দশক ধরে আড়ালে থেকে নিঃশব্দে ভালোবাসার চাকা সচল রেখেছিলেন, তাকে শ্রদ্ধা জানাতে কার্পণ্য করেনি প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনায় তার গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হয় ভালোবাসার উত্তরীয়, হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা ও উপহার সামগ্রী।
একজন সাধারণ আয়াকে বিদায় জানাতে এনে হাজির করা হলো ফুল দিয়ে সাজানো এক রাজকীয় ঘোড়ার গাড়ি। শেফালি খালা যখন ধীর পায়ে সেই সুসজ্জিত গাড়িতে উঠলেন, তখন উপস্থিত শত শত শিক্ষার্থী আর শিক্ষকের চোখ বেয়ে ঝরছিল অশ্রুধারা। গাড়ি চলতে শুরু করতেই রাজপথের দু’পাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা ফুল ছিটিয়ে রাজকীয় সম্মান জানায় তাদের প্রিয় ‘খালা’কে। দীর্ঘ ৩৪ বছর যে স্কুলকে বুকের ভেতর লালন করেছেন, সেই স্কুলের শিশুদের এমন বাঁধভাঙা কান্না দেখে আবেগ সামলাতে পারেননি শেফালি খালাও; হাত নেড়ে অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় জানান তার ভালোবাসার পৃথিবীকে।
ব্যক্তিগত জীবনে শেফালি বেগম নিঃসঙ্গ; নিজের কোনো সংসার বাঁধেননি, কোল আলো করে আসেনি কোনো সন্তান। কিন্তু এই নিঃসঙ্গতা কখনো তার হাসি কাড়তে পারেনি। কারণ, স্কুলের শত শত শিশুই ছিল তার সন্তান। টিফিনের টিফিনবক্সটা শেষ হলো কি না খেয়াল রাখা, পুড়ে যাওয়া রোদে কোমল হাতটি ধরে ক্লাসে পৌঁছে দেওয়া, কিংবা ভুল করলে পরম মমতায় গালে হাত রেখে শুধরে দেওয়া—সবই করতেন মায়ের সুনিপুণ ভালোবাসায়। কোনো শিশু অসুস্থ হলে নিজের কাজ ফেলে আয়ার চেয়ে বেশি ‘মা’ হয়ে উঠতেন তিনি।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম মিঠুর সভাপতিত্বে আয়োজন করা হয় ফাতেমা খালার বিদায় অনুষ্ঠান। প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুল ইসলামসহ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা যখন শেফালি খালার অবদান স্মরণ করছিলেন, তখন পুরো চত্বর জুড়ে ছিল কান্নার ফোঁপানির শব্দ।
নূর-ই-আলম মিঠু আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘শেফালি খালা শুধু কর্মচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের স্কুলের মূল স্তম্ভ। পদের মাপে মানুষ বড় হয় না, তার ভেতরের মমত্ববোধ ও কর্তব্যের কাছে আমরা সবাই অনেক ছোট। এই ভালোবাসার ঋণ পরিশোধ করার সাধ্য আমাদের নেই।’
বিদায়লগ্নে চোখের জলে শেফালি খালা কেবল একটি কথাই বলতে পেরেছিলেন—‘আমার বাচ্চাগুলোকে তোমরা দেখেশুনে রেখো, ওদের জন্য দোয়া চাই।’


