পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের বাসিন্দা তসলিমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন। গত মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন তিনি। বারবার ডিলারদের ফোন করেও কোনো সিলিন্ডার পাননি। শেষমেশ নিরুপায় হয়ে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট থেকে একটি বৈদ্যুতিক চুলা কিনে আনেন।
তসলিমা বেগমের এই গল্প এখন বাংলাদেশের অনেক সাধারণ পরিবারের প্রতিচ্ছবি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা এবং দেশে গ্যাসের চড়া দাম ও সংকটের কারণে মানুষ এখন দ্রুত বৈদ্যুতিক চুলার দিকে ঝুঁকছে।
বাজারে বর্তমানে ইনডাকশন, ইনভার্টার এবং ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা তুঙ্গে। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে আধুনিক বৈদ্যুতিক চুলার সারি এখন ক্রেতাদের বাড়তি আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
একই সঙ্গে ক্রেতা ও বিক্রেতারা বলছেন, এসব চুলা এলপিজির তুলনায় রান্নার খরচ কমাতে পারে, যদিও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক পরিবার এখনো এটিকে পুরো বিকল্প নয় বরং সহায়ক হিসেবে রাখছে।
এলপিজির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি এই প্রবণতাকে আরও জোরালো করেছে।
সরকার ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ২৯ শতাংশ বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করেছে, তবে বাস্তবে ক্রেতাদের তা পেতে দিতে হচ্ছে ১৯০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।
অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে একটি সিলিন্ডারে এখন আর পুরো মাস চলে না, ফলে রান্নার মোট খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই এখন খরচ সামলাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ—দুই ব্যবস্থাই ব্যবহার করছেন।
ধোলাইপাড়ের গৃহিণী শারমিন রহমান বলেন, ‘দিনের বেলা গ্যাস প্রায় পাওয়াই যায় না, রাতে কিছুটা এলেও সবসময় থাকে না, রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেজন্য আমি একটি ইন্ডাকশন চুলা কিনেছি।’
এই পরিবর্তন শুধু গৃহস্থালীতেই সীমাবদ্ধ নই। শাঁখারীবাজার মোড়ে কয়েকটি চায়ের দোকানও কার্যক্রম চালিয়ে যেতে ইন্ডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করেছে।
চা বিক্রেতা মো. সবুজ বলেন, ‘ব্যবসা চালিয়ে যেতে আমাকে ইলেক্ট্রিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে।’
রায়সাহেব বাজারের উদ্যোক্তা সুলতানা বেগম বলেন, ‘আমি খাবার রান্না করে অফিসে দিই। এ দিয়েই আমার পরিবার চলে। বেশি দামের গ্যাস কিনতে না পেরে এখন ইলেক্ট্রিক চুলায় রান্না করি।’
লক্ষ্মীবাজারের কিছু ক্রেতা জানিয়েছেন, চাহিদা এত বেড়েছে যে তারা অনেক সময় পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন।
এদিকে বিক্রেতারা জানিয়েছেন, জনপ্রিয় কয়েকটি মডেলের মজুত শেষ হয়ে গেছে, সরবরাহের থেকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বাড়ছে।
পুরান ঢাকার একজন ক্রেতা আফসার উদ্দিন বলেন, ‘দাম যতই হোক, রান্না করতে হলে এখন এটি দরকার।’
দোকানদাররা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
নিউ মার্কেট ও চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে ক্রেতারা ধীরে ধীরে এলপিজি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
নিউ মার্কেটের ক্রেতা আমান উদ্দিন বলেন, ‘সিলিন্ডারের দাম অনেক বেড়ে গেছে, তাই যে বিকল্প পাওয়া যাচ্ছে সেটাই নিচ্ছি।’
সরবরাহ সংকটের কারণে অনেকেই একসঙ্গে বেশি কিনছেন। রামপুরার একটি দোকানে কথা হয় আনিস রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বারবার চেষ্টা করেও সিলিন্ডার পাইনি, পেলেও দাম বেশি, তাই আমি তিনটি বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি।’
চাহিদা বাড়ায় বাড়ছে দেশীয় উৎপাদন
একসময় আমদানিনির্ভর থাকা বৈদ্যুতিক চুলার বাজারে এখন স্থানীয় উৎপাদকদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
উৎপাদকরা জানান, মাসিক বিক্রি গড়ে এক লাখ ইউনিট ছাড়িয়েছে, যা ভোক্তার আচরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের জনসংযোগ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক তৌহিদুজ্জামান বলেন, ‘সম্প্রতি চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে।’
তিনি জানান, বৈদ্যুতিক কুকারের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ ইউনিটে পৌঁছেছে।
ওয়ালটনের সহকারী পরিচালক অগাস্টিন সুজন বাড়ই বলেন, ‘ক্রেতারা বিকল্প খুঁজছেন, তাই বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা দৃশ্যতই বাড়ছে।’
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলপিজির দাম বৃদ্ধি এবং অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকা—দুটিই এই প্রবণতার কারণ।
কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিয়ার রহমান হায়দার বলেন, ‘শহুরে মানুষ আধুনিক ও শক্তি সাশ্রয়ী যন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে, এতে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা বাড়ছে।’
দাম ও ব্যবহারের খরচ
ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি ও ফিচার অনুযায়ী বৈদ্যুতিক চুলার দাম ভিন্ন হয় বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
ওয়ালটন, ভিশন, গাজী, কিয়াম, মিয়াকো, ফিলিপস ব্র্যান্ডের চুলার দাম সাধারণত সাড়ে তিন হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা আর প্রিমিয়াম মডেলের দাম আরও বেশি।
আরএফএলের বেস্ট বাই শোরুমে ভিশন ইন্ডাকশন চুলার দাম প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ আর ইনফ্রারেড চুলার দাম ৪ হাজার টাকা।
বেঙ্গল গ্রুপ-এর হ্যাপি মার্ট-এ গাজি প্রিমিয়াম ইনভার্টার চুলার দাম ৮ হাজার টাকা আর ইন্ডাকশন চুলা প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টাকা।
কম পরিচিত ভিগো, নোভা ও প্রেস্টিজ ব্র্যান্ডের সস্তা মডেলও বাজারে আসছে, পাশাপাশি অতিরিক্ত ফিচারযুক্ত আমদানিকৃত পণ্য বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
লক্ষ্মীবাজারের র্যাংস ই মার্ট-এ একটি হ্যাভেলস ইন্ডাকশন চুলার দাম ৫ হাজার ৮০০ টাকা।
চালানোর খরচ কম হওয়াও চাহিদা বাড়ার একটি বড় কারণ।
রাইসাহেব বাজারের গৃহিণী শারমিন সুলতানা বলেন, ‘১,২০০ ওয়াটের একটি ইন্ডাকশন চুলা প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১.২ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন চার ঘণ্টা ব্যবহার করলে দিনে ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা আর মাসে এক হাজার থেকে এক হাজার ১৫০ টাকা খরচ হয়।’
বিক্রেতারা জানান, ইন্ডাকশন চুলা সরাসরি পাত্র গরম করে তাপের অপচয় কমায়, তবে নির্দিষ্ট ধরনের ধাতব পাত্র লাগে। অন্যদিকে ইনফ্রারেড চুলায় বিভিন্ন ধরনের সমতল তলার পাত্র ব্যবহার করা যায়। এই কারণে তুলনামূলক বেশি দাম হলেও কিছু ক্রেতা ইনফ্রারেড চুলার দিকে ঝুঁকছেন।


