ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে খেলতে আসা কয়েকজন শিশুকে কান ধরে ওঠবস করানোর একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য সর্বমিত্র চাকমা শিশুদের শাসাচ্ছেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের শেষ অংশে একদল শিশু খেলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে অন্তত ৩২ জনের বেশি শিশু উপস্থিত ছিল, যাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। একই সময় মাঠের অন্য অংশে অর্থনীতি বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগের প্রস্তুতি ম্যাচ চলছিল। সেখান থেকেই সর্বমিত্র চাকমাকে একটি স্ট্যাম্প হাতে শিশুদের শাসাতে দেখা যায়।
ভাইরাল ভিডিওতে আরও দেখা যায়, হাতে একটি পাইপ নিয়ে ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমা শিশুদের ভয় দেখাচ্ছেন এবং কান ধরে ওঠবস করাতে বাধ্য করছেন।
ভিডিও ধারণ করা ব্যক্তি টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, যাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল, তারা সবাই প্রায় ১৮ বছরের নিচে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকার বাসিন্দা।
ভিডিওটিতে সর্বমিত্র চাকমার সঙ্গে জার্সি পরিহিত আরও একজন ব্যক্তিকেও দেখা গেলেও তার পরিচয় জানা যায়নি।
ভিডিওটি চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি বিকাল ৪টা ৪৪ মিনিটে ধারণ করা হয়। একই ঘটনার আরও দুটি ভিডিও টাইমস অব বাংলাদেশের কাছে এসেছে, যেখানে শিশুদের বারবার কান ধরে ওঠবস করাতে দেখা যায়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এটি সরাসরি শিশু নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। তারা বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ, শিশু আইন ২০১৩ এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী শিশুদের প্রতি কোনো ধরনের শারীরিক ও লাঞ্ছনাকর আচরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এ বিষয়ে হাজী মোহাম্মদ মহসিন হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক মো. সাইফুল্লাহ বলেন, ‘তাদের অপরাধ একটাই, তারা সেন্ট্রাল মাঠে খেলতে এসেছিল। সেই তথাকথিত “অপরাধে” লাঠি হাতে কয়েকজন কিশোরকে কান ধরে ওঠবস করাতে দেখা গেছে ডাকসুর সদস্য সর্বমিত্র চাকমাকে। ঘটনাটি শুধু ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং সারা দেশের মানুষের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হাসির পাত্রে পরিণত করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ধরে নিলেও তারা কোনো নিয়ম ভেঙেছে, তবুও কি একজন ডাকসু সদস্যের এমন শারীরিক শাস্তি দেওয়ার কোনো এখতিয়ার আছে। তাহলে প্রক্টোরিয়াল টিমের ভূমিকা কী। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি তাকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অনুমতি দিয়েছে।’
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল মাস্টারদা সূর্যসেন হলের সদস্য সচিব আবিদুর রহমান মিসু বলেন, ‘দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য ঘটনা নয়, এটি স্পষ্টতই শিশু নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান থাকবে তারা যেন ঘটনাটিকে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার পর্যন্ত নিয়ে যায়।’
ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন ডাকসু সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘যত বড় অপরাধী হোক না কেন, কাউকে লাঠি হাতে এভাবে শাস্তি দেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার আপনার নেই। আপনার দায়িত্ব হচ্ছে প্রক্টরিয়াল টিমকে অবিহিত করা; শাস্তি দেওয়ার জন্য প্রশাসন আছে।’
এ বিষয়ে সর্বমিত্র চাকমার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


