জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ক্ষমতার স্বার্থে বর্তমান সরকারই জুলাইয়ের বিভাজন তৈরি করেছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার সেসব থেকে সরে এসেছে।
রোববার বিকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলে ‘পাহাড়ে জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘চট্টগ্রাম মহানগরীতে সমমর্যাদা, সহ-অবস্থান এবং সম্প্রীতির রাজনীতি’ স্লোগানকে সামনে রেখে সভার আয়োজন করে এনসিপি।
নাহিদ বলেন, জুলাই বিভাজন যারা এখন ক্ষমতায় গেছে, তাদের ক্ষমতার স্বার্থে তারা এই বিভাজন করেছে। নির্বাচনের আগে তারা অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমান সরকার এই বিভাজনের জন্য দায়ী।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ নিয়েও সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। নির্বাচনের আগে নির্বাচনী স্বার্থে অনেক কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে সইও করা হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছেও নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর সেসবের বাস্তবায়ন হয়নি।
সনাতন ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর কোনো পক্ষই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না। মানুষ এসব দলকে চিনে রাখছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রতিশ্রুতি নয়, কাজের মাধ্যমে মানুষের পাশে থাকতে চায়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই বিপ্লব শুধু সমতলের নয়, এটি পাহাড়েরও। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির দেয়ালে এখনো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতি রয়েছে। এটি প্রমাণ করে, পাহাড়ের প্রতিটি জাতিসত্তা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিল।
‘ফ্যাসিস্টরা যখন গুলি চালিয়েছিল, তখন তারা দেখেনি কে বাঙালি আর কে পাহাড়ি। এই আন্দোলনে বহু পাহাড়ি ভাই-বোন আহত হয়েছেন, রক্ত দিয়েছেন।’
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে দেশকে বিভাজনের রাজনীতি চর্চা করা হয়েছে। তার মতে, বৈষম্য দূর করে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও অর্থনৈতিক প্রশ্নে সব জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কথা বললেও গত পাঁচ দশকে সব জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিএনপির ৩১ দফায় ‘রেইনবো ন্যাশন’-এর ধারণা থাকলেও বাস্তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব সেখানে প্রতিফলিত হয়নি। একমাত্র প্রতিনিধি দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী করা হলেও ষড়যন্ত্র করে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
পাহাড় নিয়ে এনসিপির অবস্থান তুলে ধরে নাহিদ বলেন, আমরা শুধু বাঙালির রাষ্ট্র বা শুধু মুসলমানের রাষ্ট্র গড়তে চাই না। আমরা মানুষের রাষ্ট্র গড়তে চাই, যেখানে বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু ধর্মের মানুষ সমান নাগরিক মর্যাদা নিয়ে সহাবস্থান করবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের অস্থিরতা নিরসনে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, সামরিক কায়দায় পাহাড়কে দীর্ঘদিন শান্ত রাখা বা ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সংলাপ, জবাবদিহিতা ও সুশাসন।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন ও তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিতের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষকে মূলধারায় যুক্ত করতে হবে। এনসিপি পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবে বলে তিনি জানান।


