উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী ও সুরকার শচীন দেববর্মণ স্মরণে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী শচীন মেলা। সারা বছর অবহেলার শিকার তার পৈতৃক বাড়িটি এ সময় সেজে ওঠে অনন্যরূপে। ঐতিহাসিক বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি শচীন ভক্তদের।
মেলা উপলক্ষে কুমিল্লার চর্থায় শিল্পীর পৈতৃক বাড়িটির আঙিনায় সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জেলা প্রশাসন।
শচীন দেববর্মণ ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার চর্থায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ সালে ৩১ অক্টোবর মুম্বাইয়ে মৃত্যুবরণ করেন। প্রতিবছর শচীনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অক্টোবর মাসের শেষ দুইদিন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কুমিল্লায় শচীন মেলা ও সাংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শচীনের ১১৯তম জন্মবার্ষিকী এবং ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এবারও দুই দিনের শচীন মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে কুমিল্লা জেলা প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে শচীন মেলার উদ্বোধন করবেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক। দুইদিন ব্যাপি আয়োজনের মধ্যে থাকছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, শচীন দেববর্মণের জীবনভিত্তিক প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন, শিশুকিশোরদের চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

সামাজিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লার’ সভাপতি ও শচীন গবেষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, ‘ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় রাজ পরিবারে সংগীত জগতের এই নক্ষত্রের জন্ম হয়েছিল। তার বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণ ছিলেন ওই রাজ পরিবারের সন্তান এবং ত্রিপুরার প্রধানমন্ত্রী। শচীন দেববর্মণ বিংশ শতাব্দীর কিংবদন্তিতুল্য জনপ্রিয় একজন শিল্পী। তিনি ‘শচীন কর্তা’ এবং ‘এস. ডি. বর্মন’ নামেই অধিক পরিচিত। অসংখ্য কালজয়ী বাংলা এবং হিন্দি গানের পাশাপাশি বিখ্যাত সব চলচ্চিত্রের গানের প্রবাদপ্রতিম সুরস্রষ্টা শচীন। তাকে মনে করা হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালকদের পথপ্রদর্শক।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর শচীন স্থায়ীভাবে মুম্বাই চলে যান। সেখান থেকে তার আর কুমিল্লায় ফেরা হয়নি। আর এদিকে তার ঐতিহাসিক পৈতৃক বাড়িটিও অযত্নে-অবহেলায় ধ্বংস হতে থাকে। একসময় চারপাশে আগাছা জন্মে পরিত্যক্ত বাড়িটি মাদকসেবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান সরকার বাড়ির বিশাল ফাঁকা জায়গায় সরকারি হাঁস-মুরগির খামার গড়ে তোলে।’

১৯৮৫ সালে তৎকালীন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক সৈয়দ আমিনুর রহমান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি সংরক্ষণের অংশ হিসেবে শচীনের বাড়ির দেয়ালে একটি ফলক লাগানোর পর, ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বাড়িটি পরিদর্শন শেষে এটিকে সংরক্ষণের জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন সে সময়কার তৎকালীন জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া।
ঐতিহ্য কুমিল্লাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে দীর্ঘ প্রায় ৭৫ বছরের পরিত্যক্ত দালান এবং বাড়ির ফাঁকা অংশটুকু জেলা প্রশাসনের দখলে আসে এবং ২০১৫ সালের ২৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বাড়ির সংস্কার কাজ। একই বছরের ১৬ জুন কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সুদীর্ঘ ৮ দশক পর প্রথমবারের মতো শচীন কর্তার বাড়ি মুখরিত হয় ‘শচীনের গানে গানে’।
তবে, এখনও সেখানে সরকারী হাঁস-মুরগীর খামারটি রয়ে গেছে। বিশেষ দিন ছাড়া বছরজুড়ে বাড়িটি অবহেলিত পড়ে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শচীন ভক্তরা! চমৎকার নির্মাণ শৈলীর বাড়িটি থেকে খামার সরিয়ে নিয়ে সেটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণসহ শহরজুড়ে শচীনের স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের উপর জোর দেন বিশিষ্টজনেরা।
জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়ছার জানান, শচীন দেববর্মণের বাড়িটি ঘিরে একটি আন্তর্জাতিক মানের সংগীত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও মিউজিক্যাল আর্কাইভ গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।


