মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত সরকারপ্রধান ও গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের প্রধান নেত্রী অং সান সু চির সাজা কমিয়ে কারাগার থেকে গৃহবন্দী হিসেবে স্থানান্তর করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮০ বছর বয়সী নোবেলজয়ী এই নেত্রী ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে আটক রয়েছেন। ধারণা করা হয়, মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোর একটি সামরিক কারাগারেই তাকে এতদিন আটক রাখা হয়েছিল।
অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা সামরিক প্রধান এবং বর্তমানে দেশটির সামরিক জান্তা সরকারের দায়িত্বে থাকা মিন অং হ্লাইং এক বিবৃতিতে জানান, তার অবশিষ্ট সাজা নির্ধারিত আবাসস্থলে (গৃহবন্দী) ভোগ করার জন্য নথি জারি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত একটি ছবিতে দুইজন ইউনিফর্ম পরিহিত ব্যক্তির সঙ্গে সু চিকে বসে থাকতে দেখা যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, আকস্মিকভাবে সু চির ছবি প্রকাশ করে জান্তা সরকার তার সাজা কমানোর বিষয়টি সত্য হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে।
তবে সু চির ছেলে কিম অ্যারিস সরকারি এই ঘোষণার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, তার কাছে এমন কোনো প্রমাণও নেই যে তার মা এখনো জীবিত আছেন। তিনি ছবিটিকে ‘অর্থহীন’ উল্লেখ করে দাবি করেন, এটি ২০২২ সালে তোলা।
অ্যারিস বলেন, ‘আমি আশা করি এটি সত্য। কিন্তু তাকে কারাগার থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো দেখিনি।’
‘আমাকে তার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত বা কেউ স্বাধীনভাবে তার অবস্থা ও অবস্থান নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আমি কিছুই বিশ্বাস করব না’, যোগ করেন তিনি।
সু চির সাজা কমানোর ঘোষণার আগে তার স্বাস্থ্য বা জীবনযাপনের অবস্থা সম্পর্কেও কোনো তথ্য জানা যায়নি। কিম অ্যারিস গত ডিসেম্বর বলেছিলেন, বহু বছর ধরে তিনি তার মায়ের কোনো খোঁজ পাননি।
সু চির আইনজীবী দল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানায়, তাকে গৃহবন্দী করার বিষয়ে তাদের কাছে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পৌঁছায়নি।
২০২১ সালে সামরিক বাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার দিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে অং সান সু চিকে খুব কমই প্রকাশ্যে দেখা গেছে। এমনকি তার কোনো বক্তব্যও কখনো প্রচার করা হয়নি। সু চির আইনজীবীরাও তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তার সাক্ষাৎ পাননি। পরিবারের সঙ্গে দুই বছরের বেশি সময় তার কোনো যোগাযোগ নেই।
এর আগে সামরিক সরকার তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা শুরু করলে ২০২১ সালের মে মাসে আদালতে হাজিরার সময় সু চিকে শেষবার প্রকাশ্যে দেখা যায়। সে সময় তাকে সর্বোচ্চ ৩৩ বছর কারাভোগের সাজা ঘোষণা করা হয়। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক দফায় তার সাজা কমানো হয়েছে।
অং সান সু চির সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা শন টার্নেল বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক সরকার বর্তমানে জনসংযোগের প্রচারণায় জোর দিচ্ছে। তারা বিশ্বকে বোঝাতে চাইছে যে তারা একটি বৈধ সরকার এবং সু চিকে গৃহবন্দী করার খবর সেই প্রচেষ্টারই অংশ।’
টার্নেল বলেন, তিনি এই খবর সত্যি হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হলেও তার ‘অনেক সন্দেহ’ রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান অর্থনীতিবিদ টার্নেল ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর এক বছরেরও বেশি সময় আটক ছিলেন এবং সেই সময় তিনি অং সান সু চির সঙ্গে একই কারাগারে ছিলেন।
টার্নেল অভিযোগ করেন, কারাগারের পরিস্থিতি ছিল ‘মধ্যযুগীয়’ এবং ‘খুবই ভয়াবহ’। সেখানে খাবার ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল শোচনীয়। ৮০ বছর বয়সী অং সান সু চির জন্য এসব পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অং সান সু চি মিয়ানমারের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের প্রধান মুখ এবং দেশটির সাবেক সরকারপ্রধান ছিলেন।
তিনি মূলত মিয়ানমারের গণতন্ত্র আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছেন এবং তার দায়ে বহু বছর গৃহবন্দি ছিলেন।
তিনি ২০১৫ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে কার্যত মিয়ানমারের সরকার পরিচালনা করেন। যদিও সংবিধানের কারণে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। সে সময় তিনি ‘রাষ্ট্রের উপদেষ্টা’ পদে থেকে তিনিই দেশের প্রধান নেতার ভূমিকা পালন করেন।
তার বাবা অং সান ছিলেন মিয়ানমারের স্বাধীনতার অন্যতম নেতা, তাই পারিবারিকভাবেও তিনি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পান।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
তবে পরবর্তীতে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের সময় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যার অভিযোগে তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের পক্ষ নেওয়ায় যার ফলে তার আন্তর্জাতিক সুনাম অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে আটক করা হয় এবং এরপর থেকে তিনি সামরিক বন্দী অবস্থায় ছিলেন।


