কানাডার অন্টারিও প্রদেশের থান্ডার বে শহরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ট্যাপেস্ট্রি ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস নেটওয়ার্ক আয়োজিত ‘ট্যাপেস্ট্রি ২০২৬ গালা নাইট’। ‘অ্যান ইভনিং অব এক্সপ্রেশনস’ শীর্ষক এ আয়োজনে প্রায় ২০০ অতিথির অংশগ্রহণে উদ্যাপিত হয়েছে বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা, বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দক্ষিণ এশীয় ঐতিহ্যভিত্তিক বিশেষ ফ্যাশন শো ‘ওয়ান ফ্যাব্রিক, কাউন্টলেস এক্সপ্রেশনস’। এ ছাড়া ছিল ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংগীত, নৃত্য ও বিভিন্ন দেশের খাবারের আয়োজন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন থান্ডার বে শহরের তৎকালীন মেয়র কেন বশকফ এবং পরবর্তী সময়ে নবনির্বাচিত মেয়র মরিন (মো) কোমুজ্জি। এ ছাড়া শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অতিথিরা এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ‘ওয়ান ফ্যাব্রিক, কাউন্টলেস এক্সপ্রেশনস’ শীর্ষক ফ্যাশন শোটির পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেন ফ্যাশন ও জুয়েলারি ডিজাইনার, ‘আভরণ—ওয়্যারেবল আর্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে অভিজ্ঞ সাবেক পেশাদার মডেল তাসমিয়া এমদাদ।
শাড়িকে শুধু ঐতিহ্যবাহী পোশাক হিসেবে নয়, বরং নারীর পরিচয়, আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরাই ছিল এ আয়োজনের মূল ভাবনা।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার শাড়ির ঐতিহ্য, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং নিজস্ব সাজসজ্জার ধরনকে কেন্দ্র করে সাজানো হয় পুরো পরিবেশনা। সংগীত, ফ্যাশন ও গল্পের সমন্বয়ে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয় দক্ষিণ এশিয়ার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিচয়।
আয়োজনটির মূল বার্তা ছিল—শাড়ি শুধু ছয় গজ কাপড় নয়; এর প্রতিটি ভাঁজে জড়িয়ে আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা গল্প, স্মৃতি, ভালোবাসা ও ঐতিহ্য।
কখনো মায়ের কাছ থেকে মেয়ের হাতে তুলে দেওয়া অমূল্য উপহার, কখনো দাদি-নানির স্মৃতিবিজড়িত শাড়ি, আবার কখনো উৎসব কিংবা জীবনের বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গী; দক্ষিণ এশীয় নারীদের সঙ্গে শাড়ির এমন আবেগঘন সম্পর্কই ফুটিয়ে তোলা হয় মঞ্চে। পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে শাড়ির বিবর্তন এবং আধুনিক ফ্যাশনে এর নতুন উপস্থাপনাও তুলে ধরা হয়।
ফ্যাশন শোর সূচনা হয় জেনিফার আহমেদ নির্ঝরের বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। কোক স্টুডিও বাংলার জনপ্রিয় গান ‘তাঁতি’র সঙ্গে পরিবেশনায় উঠে আসে শাড়ি বুননের ঐতিহ্য এবং তাঁতশিল্পীদের নিপুণ কারুকাজের প্রতি শ্রদ্ধা।
এরপর স্নিগ্ধা দাস ও রোদেলা মা-মেয়ের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আবেগঘন পরিবেশনার মাধ্যমে তুলে ধরেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি, ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা।
মূল রানওয়ে পর্বে মডেলরা বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী শাড়ি ও সাজসজ্জার বৈচিত্র্য উপস্থাপন করেন। প্রতিটি পরিবেশনায় ফুটে ওঠে সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতি, বস্ত্রশিল্প ও ঐতিহ্যের স্বতন্ত্র সৌন্দর্য।
পরবর্তী পর্বে ছিল আধুনিক ও ফিউশন ফ্যাশনের বিশেষ উপস্থাপনা। সমসাময়িক পোশাকের সঙ্গে শাড়ির সৃজনশীল সমন্বয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়, কীভাবে ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রেখেই নতুন প্রজন্মের ফ্যাশনে শাড়িকে আধুনিক ও বহুমাত্রিক করে তোলা সম্ভব।
ফ্যাশন শোর সমাপনী আকর্ষণ হিসেবে রানওয়েতে উপস্থিত হন মিস আর্থ কানাডা ২০১৭ খেতাবজয়ী জ্যাকলিন মার্শ। শো-স্টপার হিসেবে তার উপস্থিতি সমাপনী পর্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। পরে সব মডেলের সম্মিলিত গ্র্যান্ড ফিনালের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বর্ণিল আয়োজন।
ফ্যাশন শোর পরিচালক তাসমিয়া এমদাদের কাছে এ আয়োজন ছিল ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে সৃজনশীলভাবে তুলে ধরার একটি প্রয়াস।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ফ্যাশন শুধু সুন্দর পোশাক নয়, এটি গল্প বলার একটি শিল্পমাধ্যম। শাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আমাদের মা-নানী-দাদিদের স্মৃতি, ভালোবাসা ও শিকড়ের টান। আমি চেয়েছি সেই গল্পগুলো রানওয়েতে তুলে ধরতে এবং দেখাতে, কীভাবে একই ছয় গজ কাপড় বিভিন্ন সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অসংখ্য অভিব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে। থান্ডার বের মতো একটি বহুসাংস্কৃতিক শহরে সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতায় এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়া আমার জন্য সত্যিই বিশেষ অনুভূতি।’
তাসমিয়া এমদাদ ‘আভরণ—ওয়্যারেবল আর্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ডিজাইনার। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ফ্যাশন শোটি সফলভাবে আয়োজন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ট্যাপেস্ট্রি ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস নেটওয়ার্কের নেতৃত্বে থাকা রূপা রক্ষিত এবং ফ্যাশন শো সমন্বয়ক স্নিগ্ধা। পাশাপাশি মডেল, শিল্পী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আয়োজনটি সফল হয়।
ট্যাপেস্ট্রি ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস নেটওয়ার্ক থান্ডার বে-ভিত্তিক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। নারীর ক্ষমতায়ন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের উদ্যাপন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি গড়ে তোলা সংগঠনটির মূল লক্ষ্য।
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে আসা নারীদের নিজেদের পরিচয়, অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে সংগঠনটি।
অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে সংগঠনটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান রূপা রক্ষিত বলেন, ‘আমাদের অ্যান ইভনিং অব এক্সপ্রেশনস ছিল সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির এক সুন্দর উদ্যাপন। বিভিন্ন পটভূমি থেকে আসা প্রায় ২০০ মানুষের অংশগ্রহণ আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, পারস্পরিক সম্পর্ক ও একাত্মবোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বৈচিত্র্য আমাদের একত্র করে, কিন্তু মানবিকতাই আমাদের সত্যিকার অর্থে সংযুক্ত রাখে।’
ট্যাপেস্ট্রি ২০২৬ গালা নাইটের মধ্য দিয়ে আবারও উঠে এসেছে শিল্প, ফ্যাশন ও সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে মানুষকে একসূত্রে যুক্ত করার শক্তি। কানাডার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাংস্কৃতিক পরিচিতি ও সম্প্রীতি গড়ে তুলতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।


