ঢাকার মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল। সাপ্তাহিক ছুটির দুপুরে যাত্রীসংখ্যা কিছুটা কমই বলা চলে। যারা এসেছেন, তাদের অনেকে জানতে চাইছেন ভাড়া বেড়েছে কি না।
ময়মনসিংহগামী নাসরিন আক্তার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কাউন্টারে এক কথা বলে, বাসে উঠে আরেক কথা বলে। মাঝপথে বলে ভাড়া বাড়ছে–আমরা তো বুঝতেই পারি না আসলটা কী।’
জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়িয়েছে ১১ পয়সা। কিন্তু এর আগে নানা সময় কিলোমিটারে ২ বা ৩ পয়সা করে ভাড়া কমানোর পর কার্যক্ষেত্রে আর ভাড়া কমেনি।
এই অবস্থায় নতুন হারে ভাড়া ঘোষণার পর এখনো সব রুটে ভাড়া নির্ধারণ হয়নি।
মহাখালীতে পরিবহন কর্মীরা দাবি করছেন, বেশিরভাগ রুটে ভাড়া বাড়েনি। তবে কোনো কোনো রুটে অনেকটা বেশি নেওয়ার দাবি করছেন যাত্রীরা।

ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের ইউনাইটেড ট্রান্সপোর্টের এক কর্মী বলেন, ‘আমরা তো কোনো চার্ট পাইনি। বিআরটিএ যখন নির্ধারণ করে দেবে, তখনই আমরা সেই অনুযায়ী ভাড়া নেব। এর আগে কিছু বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব না।’
একই রুটের শ্যামলী বাংলার কর্মীরা জানিয়েছেন, সমিতির মাধ্যমে কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি।
তবে বগুড়াগামী যাত্রী আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আগে ৩০০ টাকায় যেতাম, এখন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা চাচ্ছে।’
যমুনা এন্টারপ্রাইজের এক কর্মী বলেন, ‘আমরা বাড়তি টাকা নিচ্ছি না। তেলের দাম বাড়ছে, খরচ বাড়ছে–কিছু সমন্বয় তো করতেই হয়। তবে সরকার যেটা নির্ধারণ করবে, সেটাই চূড়ান্ত।’
একতা ট্রান্সপোর্টের এক চালক বলেন, ‘অনেক সময় যাত্রীরা পুরোনো ভাড়ার কথা বলেন। কিন্তু রাস্তায় টোল, তেলের দাম–সবকিছুই তো বেড়েছে। আমাদেরও একটা হিসাব আছে।’

টার্মিনালের ভেতরে একই রুটের জন্য একাধিক কাউন্টারে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে ভাড়া বাড়েনি, পাশের কাউন্টারেই শোনা যাচ্ছে নতুন ভাড়ার ইঙ্গিত।
যাত্রীরা কাউন্টার থেকে কাউন্টারে ঘুরছেন, তুলনা করছেন।
ময়মনসিংহগামী এক কলেজ শিক্ষার্থী রাকিব হাসান টাইমসকে বলেন, ‘আমি তিনটা কাউন্টারে জিজ্ঞেস করেছি–তিন জায়গায় তিন রকম ভাড়া বলছে। শেষ পর্যন্ত যেটা একটু কম মনে হয়েছে, সেটাতেই টিকিট নিয়েছি। কিন্তু সেটাও ঠিক কিনা জানি না।’
তার সঙ্গে থাকা যাত্রী তরিকুল ইসলাম যোগ করেন, ‘এভাবে তো চলতে পারে না। একটা নির্দিষ্ট চার্ট থাকলে আমরা অন্তত জানতাম কত ভাড়া দেওয়ার কথা।’
সৌখিন পরিবহনের এক কর্মী বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করে ভাড়া বাড়াই না। তেলের দাম, ড্রাইভার-হেল্পারের বেতন, টোল–সব মিলিয়ে চাপটা আমাদের ওপরই আসে। সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটার বাস্তবায়ন দ্রুত না হলে এই সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।’
এস আর ট্রাভেলসের এক সুপারভাইজার, ‘যাত্রীরা মনে করছেন আমরা বেশি নিচ্ছি, আর আমাদের ওপর চাপ আছে খরচ সামলানোর। পরিষ্কার নির্দেশনা ছাড়া এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।’

এক টিকিট বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অনেক সময় আমাদের ওপরও চাপ থাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা তুলতে। তখন যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে একটু-আধটু বেশি নেওয়া লাগে।’
একজন বাসচালক বলেন, ‘আগে যখন ভাড়া বাড়ত, তখন খুব দ্রুত চার্ট চলে আসত। এখন সেই প্রক্রিয়াটা একটু ধীর। এর মধ্যে সবাই নিজের মতো করে চালাচ্ছে–এটাই সমস্যা।’
ভাড়ার হিসাবও কম জটিল নয়। বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটার ভাড়া, দূরত্ব, সিট সংখ্যা–সব মিলিয়ে একটি নির্দিষ্ট সূত্রে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
যেমন, ঢাকা (মহাখালী) থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার। আগে এই পথে ৪০ সিটের বাসে ভাড়া ছিল ৩১৫ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩৩০ টাকা। কিন্তু এই নির্ধারিত হার মাঠপর্যায়ে কতটা মানা হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রবীণ যাত্রী আবদুল হালিম বলেন, ‘সরকার বলে একরকম, কাউন্টার বলে আরেকরকম, বাসে উঠলে শোনা যায় তৃতীয় কথা। আমরা সাধারণ মানুষ বুঝব কীভাবে কোনটা ঠিক।’


