ঢাকার গুলশানে লেকের পাশে স্বেচ্ছাশ্রমে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ভিন্নধর্মী একটি বৃক্ষ রোপনের উদ্যোগ নষ্ট করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মীরা।
খাল পরিস্কার করার সময় আবর্জনা সরাসরি গাছের ওপর ফেলে দেওয়া হয়েছে। এতে চার বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা অনেক বিরল গাছ নষ্ট করা হয়েছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, আবর্জনা ট্রাকে করে সরিয়ে না নিয়ে এই কাজ করায় কেবল তাদের নার্সারি নষ্ট হয়নি, চলমান বৃষ্টিতে ধুয়ে ময়লা আবার খালে পড়বে।
সিটি করপোরেশনের কর্মীরা আগেভাগে জানালে তারা গাছগুলো সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারতেন, এমন আক্ষেপও করছেন তারা।
উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘কদমতলা নার্সারি’, মাহমুদ রহমান নামে একজনের চেষ্টায় এবং আরও অনেকের সম্পৃক্ততায় এর কাজ শুরু ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে।
নিজের বাসার সামনে ময়লা পরিষ্কার করে গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে শুরুটা করেন স্ত্রী ওরলা মার্ফীকে নিয়ে। ধীরে ধীরে সেটি গুলশান লেকপাড়জুড়ে বিস্তৃত হয়, সম্পৃক্ত হয় এলাকার পরিবেশপ্রেমীরা। কড়াইল বস্তির শিশু-কিশোররাও এই কাজে হাত লাগায়।
লেকের চারপাশে বর্তমানে প্রায় ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার এলাকায় এই বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ মিটারের মতো জায়গা নষ্ট করেছে ডিএনসিসি কর্মীরা, যদিও তারা দাবি করছে ১০০ মিটারের কথা।
১১ নম্বর ব্রিজ থেকে শুরু করে বনানী ক্লাবের উল্টো দিক, গুলশান-১, বনানী ও বারিধারা পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন অংশে। আলাদা করে ধরলে ১২ থেকে ১৩টি অংশে বিভক্ত এই নার্সারি।
ফুল, ফল ও ভেসজ হাজারো গাছ রোপন করা হয় সেখানে। পাখি এমনকি বেজি বা অন্যান্য প্রাণীর পছন্দের বিষয়টিও মাথায় রেখেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। সেখানে আছে ঘাস যা প্রজাপতির জায়গাও, যেখানে বসে ‘মোনার্ক’ বা ‘কমন গ্রাস ইয়েলো’ আর ‘সাদা লোচন’সহ সাত ধরনের প্রজাপতি।
এর মধ্যে একটি পানকৌড়িকে শিমুল গাছের মাথায় বসতে দেখা গেল। একটু দূরে ফলধরা একটি গাছের নিচে পড়ে থাকা আধখাওয়া ফল দেখিয়ে মাহমুদ রহমান বলেন, ‘এটার জন্য হরিয়াল পাখি আসে।’ বার্ড ফটোগ্রাফাররা হরিয়াল খুঁজতে নিয়মিত আসে এখানে।
এই দারুণ এক পরিবেশই নোংরা আবর্জনা দিয়ে নষ্ট করেছে সিটি করপোরেশন। লেক ড্রেজিংয়ের পর তোলা ময়লা আর পচা মাটি এনে ফেলা হচ্ছে নার্সারির বিভিন্ন অংশে। তবে নিয়ম মতে ময়লা তুলে গাড়িতে তুলে ডাম্প করার কথা ছিল।
দুইটি ড্রেজার কাদামাটি ফেলে ২ মে থেকে অনেক অংশ দ্রুত নষ্ট করতে শুরু করেছে। আগে যেখানে বাগান ছিল, সেখানে এখন পুরু কাদার স্তর।
বনানী হাউজিং সোসাইটির সভাপতি শওকত আলী ভূইয়া টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের ঠিকাদাররা অনেক সময় লেক থেকে তোলা ময়লা ও কাদাযুক্ত মাটি ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়ার বদলে কাছের লেকপাড়েই ফেলে রাখেন।’
কোথাও শুকনো ঘাস আর নিচু গাছ পুরো চাপা পড়ে গেছে।
মাহমুদের ভাষায়, প্রায় লেকের চারপাশে ৪০০ মিটারের মধ্যে থাকা বহু গাছ ইতোমধ্যে মারা গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘চিফ ওয়েস্ট অফিসার হুমায়ুন কবিরকে তিন বার নোট পাঠিয়েছি। পরে ওর জুনিয়র পাঠিয়েছে। কাজের কাজ হয়নি কোনো।’
‘সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে নিচু স্তরের জীববৈচিত্র্যের। যে জায়গাগুলোতে প্রজাপতি আসত, ঘাসফড়িং জন্মাত, কাছিম ডিম পাড়ত, সেগুলো ভারী কাদা আর বর্জ্যে ঢেকে যাচ্ছে। শুকনো পাতার স্তর, যেটা পোকামাকড় আর ছোট প্রাণীর আবাস ছিল, সেটাও সরিয়ে যাচ্ছে ডাম্পিংয়ের চাপে’, বলেন তিনি।
লেকপাড়ের বাসিন্দা শরীফ মারিয়া রহমান টাইমসকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বাসার সামনে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ থাকবে। এক বছর আগে এখানে বাসায় ওঠার পর সেই স্বপ্ন যেন বাস্তব হয়ে উঠেছিল। প্রতি মৌসুমে ফুলে ভরে যাওয়া গাছটি তার বারান্দা থেকে দেখা যেত, আর ভোরবেলা পাখির ডাক শুনে মনে হতো যেন ঢাকার ভেতরে কোনো গ্রামীণ পরিবেশে আছেন।’
এর পরেই তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘গত সপ্তাহে কৃষ্ণচূড়া গাছটাই পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। গাছটাতে কাকের বাসা ছিল, বিভিন্ন পাখি আসত। এখন পুরো পরিবেশটাই ধ্বংস হয়ে গেছে।’
লেক পরিস্কার করতে গিয়ে কেন পরিবেশের দূষণ হলো, এই প্রশ্নে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পরে তার কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘গুলশান লেকের মালিকানা রাজউকের। তবে রাজউকের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে গুলশান সোসাইটি লেক পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের অনুরোধে ডিএনসিসি কড়াইল বস্তিতে ও গুলশান সোসাইটি মসজিদের পাশে লেক পরিষ্কারের জন্য দুটি ভাসমান এক্সকেভেটর দিয়ে কাজ করছে।’
লেকের তলদেশে প্রচুর আবর্জনা রয়েছে এবং চারপাশে গাছ থাকার কারণে তা অপসারণের পর্যাপ্ত জায়গা নেই, একেও অযুহাত হিসেবে দেখান তিনি।


