গত এক বছর ধরে কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন না করেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন পুলিশের ১১৪ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ওএসডি করা এসব পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বেতন দিয়েছে রাষ্ট্র।
দক্ষ কর্মকর্তাদের এভাবে বসিয়ে রেখে জনগণের ট্যাক্সের টাকা ব্যয় করাকে চরম অপচয় এবং ‘অপরিণত নীতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সাবেক সচিব, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) কর্মকর্তারা এই চর্চাকে জনগণের অর্থের বড় ধরনের অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তাদের মতে, কোনো কাজ না দিয়ে কর্মকর্তাদের বসিয়ে রাখা বিশ্বের আর কোনো দেশে দেখা যায় না। এসব কর্মকর্তাদের হয় কোনো অর্থবহ কাজে নিয়োগ দেওয়া উচিত, না হয় অবসরে পাঠানো দরকার।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই সময়ে জেলা পর্যায়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে এই কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় তাদের মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে একজন অতিরিক্ত আইজিপিসহ ৮২ জন এবং পরবর্তীতে আরও ৩২ জন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়।
ওএসডি হওয়া এই ১১৪ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জন ডিআইজি, ২৭ জন অতিরিক্ত ডিআইজি এবং ৬৪ জন পুলিশ সুপার (এসপি) পদমর্যাদার। এদের মধ্যে ১১ জন ডিআইজিসহ ৭৬ জন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরের বিভিন্ন রেঞ্জ অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সরকারি আদেশে তাদের ওএসডি করার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেকে এখনো কর্মজীবনে ফেরার আশা করছেন।
প্রশাসনিক এই সংস্কৃতি নিয়ে সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের ওএসডি করে রাখা একটি অত্যন্ত দুর্বল প্রশাসনিক সংস্কৃতি। এর ফলে বছর বছর সরকারের বিপুল পরিমাণ সম্পদের অপচয় হয়।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অনেক সময় জানেনই না তাদের দায়িত্ব কী। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই সংস্কৃতির অবসান হওয়া জরুরি। কারণ, কর্মকর্তাদের যথাযথ পদায়ন না করলে তা সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে কর্মকর্তাদের কাজ না দিয়ে পূর্ণ বেতন দেওয়ার নজির নেই। প্রশাসনিক কারণে ওএসডি বড়জোর দুই থেকে চার মাস হতে পারে, কিন্তু বছরের পর বছর এটি চালিয়ে যাওয়া অপ্রয়োজনীয়।
তিনি জানান, ওএসডি অবস্থায়ও কর্মকর্তারা বেতন, ভাতা এবং ব্যাংক ঋণের মতো সব সুবিধা ভোগ করেন। এমনকি যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ওপরের কর্মকর্তারা গাড়ি ও আবাসন সুবিধাও পেয়ে থাকেন, যা অনেক সময় তারা ব্যক্তিগত কাজে বা ব্যবসায় ব্যয় করেন।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, পেশাগত ব্যর্থতা বা দুর্নীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে ঢালাওভাবে ওএসডি করার এই চর্চা মূলত অতীতের নেতিবাচক রাজনীতিরই পুনরাবৃত্তি।
তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী ও লুটেরা শাসনামলে পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল নতুন সরকার সেই ‘প্রতিশোধমূলক’ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসবে, কিন্তু বর্তমানে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওএসডি হওয়া বেশ কয়েকজন ডিআইজি ও এসপি জানান, তারা সরকারি আদেশ পালন করতে বাধ্য এবং ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা অনুযায়ীই কাজ করেছেন। তারা স্বেচ্ছায় কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। দায়িত্ব পালনকালে কোনো আইনি লঙ্ঘন হলে তার জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। তবে তারা বেতন নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে চান না, দ্রুত সক্রিয় কর্মজীবনে ফিরতে ইচ্ছুক।
সরকারি বেতন কাঠামোর হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে এই কর্মকর্তাদের পেছনে রাষ্ট্রের প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ২০১৫ সালের বেতন স্কেল অনুযায়ী, ৩য় গ্রেডের একজন ডিআইজি বাড়িভাড়াসহ মাসে ১ লাখ ২ হাজার ৬৫০ টাকা এবং ভাতা বাবদ আরও ২০ হাজার টাকা পান। একইভাবে ৪র্থ গ্রেডের অতিরিক্ত ডিআইজি এবং ৫ম গ্রেডের পুলিশ সুপাররাও বড় অঙ্কের বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন। যদিও মাঠপর্যায়ে কর্মরত থাকাকালীন তারা যেসব সোর্স মানি বা গাড়ি সুবিধা পেতেন, ওএসডি অবস্থায় তা বন্ধ থাকে।
এদিকে, গত ৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে সরকার পাঁচজন অতিরিক্ত আইজিপিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। তারা হলেন সারদা পুলিশ একাডেমির প্রিন্সিপাল মো. তৌফিক মাহবুব চৌধুরী, নৌ পুলিশের কুসুম দেওয়ান, পুলিশ সদর দপ্তরের আবু হাসান মুহাম্মদ তারিক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আব্দুল আলিম মাহমুদ এবং ট্রেনিং রিজার্ভের মো. মাসুদুর রহমান ভূঁইয়া।
এর আগে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ ও র্যাবের ১০৩ জন কর্মকর্তার পদক বাতিল করেছে সরকার। এই তালিকায় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন এবং ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়াসহ র্যাবে কর্মরত বেশ কয়েকজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তাও রয়েছেন।


