পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় এক অনন্য ইতিহাস রচিত হলো গত রোববার। নেপালের ৫৬ বছর বয়সী পর্বতারোহী কামি রিতা শেরপা ৩২ বারের মতো পা রাখলেন এভারেস্টের চূড়ায়। নিজের গড়া সবচেয়ে বেশিবার এভারেস্ট জয়ের বিশ্ব রেকর্ডটিকে নিয়ে গেলেন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায়।
সাধারণ মানুষের চোখে ৩২ বার এভারেস্ট জয় করা এক অতিমানবীয় কীর্তি হলেও, কামি রিতার কাছে এটি তার যাপিত জীবনেরই অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্বতারোহীদের এভারেস্টের চূড়ায় নিয়ে যাওয়াই তার পেশা। তিনি এভারেস্টে আরোহনের গাইড বা শেরপা।
মৃদুভাষী ও বিনয়ী স্বভাবের এই মানুষটি পাহাড়ের বেস ক্যাম্পে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, “আমি কোনো বিশ্ব রেকর্ড গড়তে বা খ্যাতি অর্জন করতে পাহাড়ে যাচ্ছি না। পর্বতারোহীদের নিরাপদে চূড়ায় নিয়ে যাওয়াই আমার পবিত্র দায়িত্ব। আমি কেবল সেই দায়িত্বটুকুই পালন করছি।”
এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে, পেশার প্রতি তার সততা ও নিষ্ঠা কতটা গভীর।
কামি রিতার এই হিমালয় জয়ের মহাকাব্য শুরু হয়েছিল আজ থেকে তিন দশক আগে, ১৯৯৪ সালে। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। প্রথম আরোহণের সেই রোমাঞ্চকর অনুভূতির পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই তিনি ফিরে এসেছেন এই বরফে ঢাকা মৃত্যুর উপত্যকায়। তুষারঝড়, বরফধস কিংবা করোনা মহামারির মতো বড় কোনো প্রাকৃতিক বা বৈশ্বিক বিপর্যয় ছাড়া কোনো কিছুই তাকে এভারেস্ট থেকে দূরে রাখতে পারেনি। ২০১৮ সালের মে মাস থেকে এভারেস্টে সবচেয়ে বেশিবার আরোহণের বিশ্ব রেকর্ডটি তিনি নিজের দখলে রেখেছেন। এরপর থেকে প্রতি বছর তিনি নিজেই নিজের রেকর্ড ভাঙছেন আর নতুন করে গড়ছেন।
১৯৭০ সালের ১৭ জানুয়ারি নেপালের সোলুখুম্বু জেলার প্রত্যন্ত থামে গ্রামে জন্ম নেওয়া কামি রিতার রক্তেই ছিল পাহাড়ের ডাক। তার বাবাও ছিলেন এভারেস্টের একজন প্রধান শেরপা। বাবার সেই পদচিহ্ন অনুসরণ করেই কামি রিতা আজ নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। এবারের অভিযানে তিনি ‘১৪ পিক এক্সপেডিশন’-এর অধীনে একটি আন্তর্জাতিক অভিযাত্রী দলের নেতৃত্ব দিয়ে সাফল্যের সাথে চূড়ায় পৌঁছান।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি বাড়ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরফ গলছে, বাড়ছে বড় বড় দুর্ঘটনার শঙ্কা। একই সাথে রয়েছে নির্ভরযোগ্য কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। এসব কারণে নেপালের তরুণ শেরপা ও অভিজ্ঞ গাইডরা যখন এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন, তখন কামি রিতার এই অবিচল পথচলা পুরো শেরপা সমাজকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
রেকর্ড গড়ায় একসময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী পাস দাওয়া শেরপা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাহাড় থেকে দূরে থাকলেও, কামি রিতা একাই লড়ে যাচ্ছেন এই শিল্পের বাতিঘর হয়ে।
হিমালয়ের বুকে গত রোববারটি ছিল রেকর্ডের এক অনন্য দিন। একদিকে কামি রিতা যখন তার ৩২তম জয়ের ইতিহাস লিখছিলেন, ঠিক সেই দিনই লাকপা শেরপা নামের এক নেপালি নারী পর্বতারোহী ১১ বারের মতো এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন। নারী হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার এভারেস্ট জয়ের রেকর্ডটি আগেই ছিল তার দখলে, এবার তিনি সেটি আরও মজবুত করলেন।
হিমালয় চিরকালই মানুষের ধৈর্য আর সাহসের কঠিন পরীক্ষা নেয়। কামি রিতা শেরপা সেই পরীক্ষায় ৩২ বার উত্তীর্ণ হয়ে নিজেকে শুধু একজন কিংবদন্তি পর্বতারোহী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন মানুষের অপরাজেয় শক্তির এক জীবন্ত প্রতীক। ইতিহাসের পাতায় তার এই কীর্তি অম্লান হয়ে থাকবে চিরকাল।


