চার মাস ধরে চাকরি খুঁজছেন রাকিব বিন মোমেন। মাঝারি পর্যায়ের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গত বছর একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে তিনি বিদেশি একটি কোম্পানিতে রিমোট চাকরি নেন। এরপর হঠাৎ সেই কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে আবার চাকরির বাজারে ফিরে আসেন তিনি। যে বাজার আগের তুলনায় অনেক বেশি সংকুচিত।
একের পর এক জায়গায় চেষ্টা করেও সাফল্য না পেয়ে তিনি বলেন, ‘চাকরির সুযোগ স্পষ্টতই কমে গেছে।’
তার অভিজ্ঞতায় বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে চলমান একটি বড় পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার নিয়োগের ধরন বদলে দিচ্ছে, কিছু কাজের জায়গা সংকুচিত করছে এবং নতুনভাবে অনেক কাজকে সংজ্ঞায়িত করছে। এর ফলে বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুতে থাকা পেশাজীবীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে এআই প্রায় ৩০ কোটি পূর্ণকালীন চাকরির সমতুল্য কাজ প্রতিস্থাপন করতে পারে। যদিও এ ধরনের পূর্বাভাস নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, সাম্প্রতিক শ্রমবাজারের তথ্য বলছে, এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চের শুরুর দিকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে ৪৫ হাজার ৩৬৩টি চাকরি ছাঁটাইয়ের তথ্য নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ২৩৮টি—অর্থাৎ ২০ দশমিক ৪ শতাংশ—সরাসরি এআই ও অটোমেশনের কারণেই হয়েছে। ২০২৫ সালে যেখানে ৮ শতাংশের কম ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে এআইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
একই সময়ে নিয়োগের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিগন্যালফায়ারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৫টি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি-লেভেল নিয়োগ ২৫ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে লিংকডইনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের পর থেকে এআই–সম্পর্কিত চাকরির বিজ্ঞাপন ৩৪০ শতাংশ বেড়েছে, আর প্রচলিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরি ১৫ শতাংশ কমেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর প্রভাব বাংলাদেশের সফটওয়্যার খাতেও পড়তে শুরু করেছে। এন্ট্রি-লেভেলের চাকরি পেতে নতুনদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠছে।
সিনেসিস আইটির প্রধান কৌশল কর্মকর্তা আমিনুল বারী শুভ্র এই পরিবর্তনকে গভীর বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি একেবারেই ব্যতিক্রমী পরিবর্তন। নির্দিষ্ট কিছু ধরনের চাকরিতে এআই যে বড় ধরনের ধাক্কা দিচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
‘যাদের সফটওয়্যার আর্কিটেকচারের ওপর ভালো দখল নেই, তাদের জন্য টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে,’ তিনি যোগ করেন।
তার মতে, নিয়োগের সিদ্ধান্ত এখন আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কর্মী চলে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো সেই শূন্য পদ আর পূরণ করছে না।
একই কথা বলেন টাইগার আইটির পরিচালক এএইচএম রাশেদ সরওয়ারও। তার প্রতিষ্ঠানেও নিয়োগে সংযত নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, অনেক শূন্য পদ খালি রাখা হচ্ছে।
তবে যে প্রযুক্তি চাকরিতে চাপ তৈরি করছে, সেটি বাড়াচ্ছে উৎপাদনশীলতাও। শুভ্র বলেন, আগে যে কাজ শেষ করতে প্রায় দুই সপ্তাহ লাগত, এখন তা অনেক কম সময়ে করা সম্ভব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সফটওয়্যার প্রকৌশলী বলেন, আগে যেটি করতে এক দিন লাগত, এখন এজেন্টিক এআই টুল ব্যবহার করে এক থেকে দুই ঘণ্টায় করা যাচ্ছে।
তবে কারও কারও মতে, নিয়োগ কমে যাওয়ার কারণ শুধু প্রযুক্তি নয়। সরওয়ার বলেন, আগের সরকারের সময়ে শুরু হওয়া অনেক সরকারি প্রকল্প বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেও এসব প্রকল্প চালু করা হয়নি।
‘তাছাড়া এখনও নতুন কোনো প্রকল্প শুরু হয়নি,’ তিনি বলেন। ‘প্রকল্পগুলো আবার শুরু হলে খাতটি কিছুটা গতি ফিরে পাবে এবং নিয়োগও বাড়তে পারে।’
এদিকে এক্ষেত্রে শিক্ষাবিদেরা তুলনামূলক সংযত দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নতুন নয়—তবে এর গতি এখন অনেক বেশি।
তিনি বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। মৌলিক প্রোগ্রামিংয়ের চাহিদা কমতে পারে, কিন্তু নকশা, পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও উদ্ভাবনে মানুষের ভূমিকা অপরিহার্যই থেকে যাবে।’
তিনি এখন ধারাবাহিকভাবে দক্ষতা উন্নয়ন প্রয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, এক ধরনের দক্ষতা দিয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকা আর সম্ভব নয়। সেজন্যই তার বিভাগ দীর্ঘদিন ধরেই এআই নিয়ে গবেষণা করছে এবং সম্প্রতি এআই ও ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পেশাগত মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু করেছে।
এআইয়ের প্রভাব সফটওয়্যার প্রকৌশল খাতের বাইরে আরও বিস্তৃত। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতে, কাস্টমার সার্ভিস, কল সেন্টার, ডাটা এন্ট্রি ও দাপ্তরিক কাজ সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।
কাস্টমার সার্ভিসের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ অটোমেশনের আওতায় আসতে পারে, কারণ এআই–চালিত চ্যাটবট ও ভয়েস এজেন্ট এখন সামনের সারির সেবা দিচ্ছে। ডাটা এন্ট্রির ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি—প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে। এআই সিস্টেম প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজারের বেশি নথি নিয়ে খুব কম ভুল করে কাজ করতে পারে।
তীব্র পরিবর্তনের পরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই নতুন সুযোগ তৈরি করছে—যদিও তা সবার জন্য সমানভাবে নয়। সেখানে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া।
রাকিবের মতো কর্মীদের জন্য এই পরিবর্তন এখন ব্যক্তিগত বাস্তবতা। আর পুরো শিল্পখাতের জন্য এটি এক ধরনের মোড় পরিবর্তনের সময়—যেখানে টিকে থাকার জন্য অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার সক্ষমতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশে এআইয়ের কারণে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মতো বড় পরিসরে চাকরি ছাঁটাই হওয়ার দাবির পক্ষে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। দেশে এআইয়ের ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং সরকারের নজরদারিতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বড় কোনো ঝুঁকি এখনো ধরা পড়েনি। তবে তিনি জানান, বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এআইকে ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি উন্নয়নে ‘অসাধারণ’ ফল দিতে পারে। তিনি যোগ করেন, অনেক তরুণ ইতিমধ্যে এআই–সম্পর্কিত পড়াশোনা ও কাজের জন্য বিদেশে যাচ্ছে। কর্মশক্তিকে প্রস্তুত করতে সরকার দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় এআই ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা করেছে।


