মিয়ানমারের বিপক্ষে ২-১ গোলে জয় পেয়েই নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। প্রথমবারের মতো তারা জায়গা করে নিয়েছে এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মূলপর্বে—যেখানে আগে কখনও লাল-সবুজ পতাকা উড়েনি। কিন্তু এই জয় শুধুই একটি স্কোরলাইন নয়, এটি একটি যাত্রার ফল, দীর্ঘ পরিশ্রম আর স্বপ্ন বুনে চলার প্রতিফলন।
এই ঐতিহাসিক অর্জনের পেছনে যে দুটি নাম বারবার উঠে আসে, সেগুলো হলো কোচ পিটার বাটলার এবং মাঠের মাঝখানে এক ঝলক আলোর মতো খেলে যাওয়া ঋতুপর্ণা চাকমা।
“ঋতুপর্ণা বাংলাদেশের মেসি। ও যেভাবে বল টেনে নিয়ে যায়, মেসি ছাড়া আর কারও মতো নয়।”-বললেন মাহফুজা আক্তার কিরণ
কোনও তুলনার অবকাশ নেই—তবে আলাদা করে সবার প্রশংসা যেন নিজের নিজের জায়গায়। জাতীয় দলের সম্ভাবনাময় মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীকেও এই প্রসঙ্গে নিয়ে আসেন কিরণ,
“হামজাও ভালো ফুটবলার, আমাদের গর্ব। সামনে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ম্যাচ আছে। আমার বিশ্বাস সেখানেও সে ভালো করবে। ছেলে-মেয়ে দল আলাদা নয়, দুটো দলই আমাদের। কিন্তু ঋতুপর্ণা যে মেসির মতো বল নিয়ে এগিয়ে চলে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।”
মিয়ানমারের বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোল করে ইতিহাস গড়েছেন ঋতুপর্ণা। বাংলাদেশের নারী দল প্রথমবারের মতো উঠেছে এএফসি নারী এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে, যেটি অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের মার্চে, অস্ট্রেলিয়ায়। এই টুর্নামেন্ট সামনে রেখে এখন থেকেই পরিকল্পনা সাজিয়ে নিচ্ছে বাফুফে।
“অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের অনেক সুযোগ আছে,” বলেন কিরণ।
“আমি কাল-পরশুর মধ্যেই সভাপতির সঙ্গে বসে বিস্তারিত আলোচনা করবো। যেহেতু সুযোগ এসেছে, সেটা কাজে লাগাতে হবে। আমরা শক্তিশালী দলের সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলতে চাই। জাপান, কোরিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া—এদের বিপক্ষে খেলতেই হবে আমাদের প্রস্তুতির জন্য।”
প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইংলিশ কোচ পিটার বাটলারকে নিয়েও রয়েছে আলাদা আস্থার জায়গা। নারী দলের বিদ্রোহ ও দল পুনর্গঠনের মাঝেও যাঁরা প্রমাণ করেছেন নিজের জায়গা—ঋতুপর্ণা তাঁদেরই একজন। আর সে জায়গা থেকে কিরণের কণ্ঠে শোনা যায় গভীর কৃতজ্ঞতা: “ধন্যবাদ বাটলারকে। খুব ভালো কোচ। সে জানে কীভাবে ডাগআউট থেকে দল এগিয়ে নিতে হয়। তার সঙ্গেও এ নিয়ে অনেকবার কথা হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, তার কোচিংয়ে নারী দল আরও অনেক দূর যাবে।”
এশিয়ান কাপে ভালো করার লক্ষ্য শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং ‘সেরা ছয়ে’ থাকার। বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নকেও এবার আর ফেলে না রেখে সামনে এনেছেন কিরণ, “আমাদের বড় স্বপ্ন—বিশ্বকাপ। এখন থেকেই লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। যেসব প্রীতি ম্যাচ আমরা খেলবো, সেগুলো আমাদের তৈরি হতে সাহায্য করবে।”
তবে সেই পথচলায় দরকার বড় মঞ্চের অভিজ্ঞতা। বর্তমানে বাংলাদেশের বেশ কিছু খেলোয়াড় যেমন ঋতুপর্ণা ভুটানে লিগ খেলছেন, কিন্তু কিরণ জানিয়ে দিয়েছেন—সেটা কোনও স্থায়ী সমাধান নয়।
“ভুটানের লিগে তারা খেলছে নিজেদের ইচ্ছায়। আমরা ভুটানকে ভালো লিগ মনে করি না। তবে ওরা যেতে চেয়েছে বলে মানসিকভাবে চাঙা থাকার জন্য সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু ওদের ইউরোপিয়ান বা বড় দেশের লিগে খেলতে হবে। ঋতুপর্ণা যদি এই ফর্মে থাকে, আমি নিশ্চিত ইউরোপ থেকে ওর জন্য প্রস্তাব আসবে।”
মাঠের সীমানা পেরিয়ে এখন নতুন দিগন্তের খোঁজে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। আর সেই পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন লাজুক, শান্ত অথচ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারা তরুণী—ঋতুপর্ণা চাকমা। যাঁকে এখন সবাই এক নামে চেনে। যাঁর জন্য কেবল বল চলে না, বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের ফুটবলভাগ্য।
ঋতুপর্ণা শুধু গোলের জন্য লড়েন না, তিনি প্রতীক হয়ে উঠছেন সম্ভাবনার। আর বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল? তারা প্রমাণ করছে, সাহস আর স্বপ্ন থাকলে লাল-সবুজ পতাকাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।


