করেনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কিটের মজুদ এবং টিকা দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনা পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত কিটের মজুদ নেই, নেই প্রয়োজনীয় টিকা। সংকট মোকাবিলায় সরকারের কাছে এখন রয়েছে ৩৮ হাজার শনাক্তকরণ কিট আর ৩১ লাখ টিকা। যা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় নিতান্তই কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের টিকা নিতে হবে। এছাড়া অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে প্রতিবার গর্ভধারণের পর টিকা গ্রহণ করতে হবে।
৩৮ হাজার শনাক্তকরণ কিট মজুদ
করোনা পরীক্ষার পর্যাপ্ত কিট মজুদ রয়েছে কি না-জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘করোনা শনাক্তের কিট সংগ্রহে জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও দেশি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কিট সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।’
‘বর্তমানে অধিদপ্তরের কাছে ৩৮ হাজার কিট রয়েছে। এরমধ্যে ২৮ হাজার র্যাপিড অ্যান্টিজেন এবং ১০ হাজার আরটিপিসিআর (রিয়েল টাইম পলিমার চেইন রিঅ্যাকশন) কিট রয়েছে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত সর্বমোট ১ কোটি ৫৭ লাখ ২৬ হাজার ৭৯৪টি টেস্ট করা হয়েছে। এরমধ্যে আরটিপিসিআর টেস্ট ১ কোটি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার ২৩৭টি, জিন এক্সপার্ট টেস্ট ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৯ ও র্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট ১৮ লাখ ২৭ হাজার ৫০৮টি টেস্ট করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের কাছে ১ লাখ আরটিপিসিআর কিট ও ৫ লাখ দ্রুত শনাক্তকরণ কিট চাওয়া হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সরকারের কাছে কিট বিক্রি করত, তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। পাশাপাশি ঢাকায় চীনা দূতাবাসের সঙ্গেও কথা হয়েছে।’
টিকার মজুদও কম
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, করোনার আগের সংক্রমণের সময় সংগ্রহ করা টিকার মধ্যে তাদের হাতে এখন ৩১ লাখ ফাইজারের টিকা আছে। যা মোট জনসংখ্যার তু্লনায় নিতান্তই কম। এরমধ্যে গত দুই মাসে ১৭ লাখ ১৬ হাজার ৯০০ ডোজ ফাইজারের টিকা সব জেলায় পাঠানো হয়েছে, যার মেয়াদ শেষ হবে ৬ আগস্ট।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, অন্তঃসত্ত্বা এবং যাদের শ্বাসতন্ত্রের রোগ রয়েছে তাদের টিকা নিতে হবে। অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের সব সাব-ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে নতুন টিকা বিশেষ কার্যকর, তবে পুরোনো টিকাও রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের হাতে বাকি ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ১০০ টিকা মজুদ রয়েছে। আমরা সেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রদানের ব্যবস্থা করব।’

২৪ ঘণ্টায় ২ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ১৫
গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন আরো ১৫ জন। এনিয়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০ লাখ ৫১ হাজার ৮০০-তে পৌঁছেছে।
শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো করোনাবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ২৪ ঘণ্টায় ১৭৪ জন ব্যক্তির থেকে নেওয়া নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এসময়ে ৩ জন রোগী করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন।
সবশেষ গত বুধবার (৪ জুন) করোনায় একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আজ মিলিয়ে দেশে ২৯ হাজার ৫০২ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
টিকার আদ্যোপান্ত
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টার্গেট ছিল বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা। তাতে ১১ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৩ জনকে ভ্যাকসিনেট করা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
সে সময় প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন ১৫ কোটি ৯ লাখ ২৫ হাজার ৬২০ জন, যা জনসংখ্যার বিপরীতে ৮৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। দ্বিতীয় ডোজের টিকা গ্রহণ করেছেন ১৪ কোটি ২২ লাখ এক হাজার ৬৮৪ জন, যা জনসংখ্যার বিপরীতে ৮৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তৃতীয় ডোজের টিকা নিয়েছেন ৬ কোটি ৮৬ লাখ ১৫ হাজার ২৫০ জন, যা দুই ডোজের বিপরীতে ৪৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। চতুর্থ ডোজের টিকা নিয়েছেন ৫১ লাখ ৫৫ হাজার ৯৭৩ জন।
এরমধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন দুই কোটি ৭৬ লাখ নয় হাজার ৪৬৭, দ্বিতীয় ডোজের এক কোটি ৯৫ লাখ পাঁচ হাজার ৭৬৭, তৃতীয় ডোজের ১ কোটি ৬০ লাখ চার হাজার ১৯৩ ও চতুর্থ ডোজের ১ হাজার ৩৪১ জন।
ফাইজারের প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন দুই কোটি ২৬ লাখ ৭৩ হাজার ৪৬১, দ্বিতীয় ডোজের দুই কোটি ১৭ লাখ নয় হাজার ৭৫২, তৃতীয় ডোজের তিন কোটি তিন লাখ ৬২ হাজার ৬৩০ ও চতুর্থ ডোজের ৩১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৩ জন।
সিনোফার্মের প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন পাঁচ কোটি ৬৮ লাখ ২৫ হাজার ৭৪১, দ্বিতীয় ডোজের পাঁচ কোটি ৫৪ লাখ ৩০ হাজার ২৮৯, তৃতীয় ডোজের ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৫০ ও চতুর্থ ডোজের ২২ হাজার ১৭৮ জন।
মডার্নার প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন ৩৭ লাখ ৭৮ হাজার ৯২৬, দ্বিতীয় ডোজের ৩৫ লাখ ৪৭ হাজার ৫৫৭ ও তৃতীয় ডোজের ৮৪ লাখ ৮১ হাজার ৬৪৩ জন।
সিনোভ্যাকের প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন ২ কোটি ৭৫ লাখ ৯২ হাজার ২০, দ্বিতীয় ডোজের দুই কোটি ৫৫ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৪ ও তৃতীয় আট কোটি ১২ লাখ এক হাজার ৮৪২ জন।
জনসন অ্যান্ড জনসনের প্রথম ডোজে টিকা কেউ নেননি। দ্বিতীয় ডেজের পাঁচ লাখ ৮০ হাজার ৯৩৪ ও তৃতীয় ডোজের টিকা নিয়েছেন ২৬ হাজার ৩২০ জন।
ফাইজার অ্যান্ড বায়োটেকের প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন এক কোটি ৯২ লাখ ৮৫ হাজার ১৪০ ও দ্বিতীয় ডোজ এক কোটি ৫৮ লাখ ২০ হাজার ৩১৪ জন।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার নতুন সাব ভ্যারিয়েন্টগুলোর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার খবরটি এসেছে ঠিক ঈদের সময়। এ সময় বহু মানুষ পশুর হাটে একত্রিত হয়েছেন। ছুটিতে বড় বড় শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার সময় মানুষকে দীর্ঘ সময় বাস-ট্রেন-লঞ্চে ভিড়ের মধ্যে থাকতে হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও ভিড় ছিল প্রচণ্ড। এসবই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
দেশে করোনা সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দেশে কোভিডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটাকে ভ্যারিয়েন্ট অব মনিটরিং হিসেবে উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণ করছে। আক্রান্তদের মধ্যে যদি কারও কো-মর্বিডিটি থাকে, তবে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবেন। এখনই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের অবস্থা সৃষ্টি হয়নি।’
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। সংক্রমণ দ্রুত ও বেশি ছড়িয়ে পড়লে তা ঝুঁকি বাড়াবে। সুতরাং সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যারা এর আগে করোনা টিকার বুস্টার ডোজ গ্রহণ করেননি এবং যাদের কো-মর্বিডিটি রয়েছে (যেমন—হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, শ্বাসতন্ত্রের রোগ ইত্যাদি) তাদের টিকা নিতে হবে। যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদেরও টিকা নিতে হবে। এছাড়া অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে প্রতিবার গর্ভধারণের পর টিকা গ্রহণ করতে হবে।’
২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিনজনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর ওই বছরের ১৮ মার্চ দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। ২০২১ সালের ৫ ও ১০ আগস্ট দু’দিন করোনায় সর্বাধিক ২৬৪ জন করে মারা যান। দেশে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২০ লাখ ৫১ হাজার ৮০০ জন। এরমধ্যে সুস্থ হয়েছেন ২০ লাখ ১৯ হাজার ৪০১ জন। মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ৫০২ জনের।
চলতি বছরের ৪ জুন করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীতে একজনের মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, করোনায় মারা যাওয়া ওই ব্যক্তি পুরুষ। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।


