ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আইডিইএ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের একটি টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগের শুনানিতে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকর্তারা।
একই সঙ্গে তারা পুরো বিষয়টির দায় ই-জিপি সিস্টেমের ওপর চাপিয়েছেন বলে শুনানিতে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের আইডিইএ প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)-এর কাছে আপিল করে টেন্ডারে অংশ নেওয়া সিনেসিস আইটি লিমিটেড।
তাদের অভিযোগে বলা হয়, কারিগরি মূল্যায়নের নম্বর প্রকাশ না করা, আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণের বিষয়ে দরদাতাদের অবহিত না করা এবং বাধ্যতামূলক একাধিক ধাপ অনুসরণ না করে ডায়নামিক সলিউশন ইনোভেটরস (ডিএসআই) লিমিটেডকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ জুন বিপিপিএ চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন কার্যক্রম স্থগিত করে এবং ২২ জুন শুনানির দিন নির্ধারণ করে। এরপর সোমবার বিপিপিএ-এর রিভিউ প্যানেলে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
সেখানে আইডিইএ প্রকল্প পরিচালক ও কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো ভুল ছিল না। কোনো ত্রুটি হয়ে থাকলে তা ই-জিপি সিস্টেমের কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে হয়েছে। তাদের ধারণা ছিল, ই-জিপি পোর্টাল থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব তথ্য ও নোটিশ দরদাতাদের কাছে পৌঁছে যাবে।
ইসির এমন ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে বিপিপিএ রিভিউ প্যানেলের বিচারকরা প্রশ্ন তোলেন–দরপত্রের নিজস্ব আরএফপি ডকুমেন্ট কেন অনুসরণ করা হলো না? অংশীজন বা দরদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যখন তথ্য পাচ্ছিল না, তখন ই-জিপি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কেন যোগাযোগ করা হয়নি? বিশেষ করে, টেন্ডার নোটিশের আরএফপি ডকুমেন্টের ‘ইনস্ট্রাকশন টু কনসালটেন্টস’ (আইটিসি)-এর ধারা অনুযায়ী, কারিগরি মূল্যায়ন অনুমোদিত হওয়ার পর ই-জিপি সিস্টেমের মাধ্যমে উত্তীর্ণ সব পরামর্শককে স্কোর জানানো এবং আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ সভার অন্তত এক সপ্তাহ আগে নোটিশ দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল।
নিজেদের প্রস্তুত করা টেন্ডারের এসব শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়ে ইসি পক্ষ বারবার ই-জিপির অজুহাত দিলেও তারা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি বলে জানায় সূত্র।
সূত্র আরও জানায়, নিজেদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ইসির প্রতিনিধিরা একপর্যায়ে দাবি করেন, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি লিমিটেড পূর্ববর্তী একটি দরপত্রের কাজ সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি, যার কারণে তাদেরকে এবার বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তখন বিচারকরা বলেন, সেটি আলাদা প্রসঙ্গ।
এদিকে, শুনানি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শুনানিতে উপস্থিত সিনেসিস আইটির এক কর্মকর্তা বলেন, ইসির আইডিইএ প্রকল্পের কর্মকর্তারা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫ এবং তাদের নিজস্ব আরএফপি ডকুমেন্টের কোনো তোয়াক্কাই করেননি। শুনানিতে কোনো যৌক্তিক আইনি ব্যাখ্যা দিতে না পেরে তারা এখন ই-জিপি সিস্টেমের ওপর দায় চাপিয়েছেন।
অন্যদিকে, শুনানিতে অংশ নেওয়া ইসির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ই-জিপিতে নিয়মের বাইরে গিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। শুনানিতে আমরা আমাদের যাবতীয় যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ দেখিয়েছি। এর বাইরে এখন আর মন্তব্য করতে চাননি তারা।
জানতে চাইলে বিপিপিএ-এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, রিভিউ প্যানেলে তিনজন স্বাধীন বিচারক উপস্থিত থাকেন, যারা বিপিপিএ-এর সরাসরি কর্মকর্তা নন। শুনানির পর সাধারণত রায় প্রস্তুত করতে ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগে। বিচারকরা রায় চূড়ান্ত করে সম্পূর্ণ সিলগালা খামে বিপিপিএ’র কাছে পাঠাবেন। এর আগে রায়ের ফলাফল বা ভেতরের তথ্য সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগ কারও নেই।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অধীন ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রজেক্ট (সেকেন্ড ফেজ)’ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ ভোটার রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম এবং অটোমেটিক বায়োমেট্রিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত কাজের জন্য এই দরপত্র আহ্বান করা হয়।
কোয়ালিটি অ্যান্ড কস্ট বেইজড সিলেকশন পদ্ধতির এই টেন্ডারে কারিগরি মূল্যায়নে ৮০ শতাংশ এবং আর্থিক প্রস্তাবে ২০ শতাংশ নম্বর নির্ধারিত ছিল। প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত সিনেসিস আইটি লিমিটেড এবং ডায়নামিক ইনোভেটরস লিমিটেড টিকে থাকে। কিন্তু আইন ও বিধি অনুসরণ না করেই ডিএসআইয়ের অনুকূলে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড জারি করার অভিযোগ ওঠে।
গত ৭ জুন বিপিপিএ রিভিউ প্যানেলে দায়ের করা আপিল আবেদনে সিনেসিস আইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, কিউসিবিএস পদ্ধতিতে কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ, আর্থিক মূল্যায়ন ও সম্মিলিত মূল্যায়ন সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিংপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেগোশিয়েশনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
কারিগরি মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ সভার তারিখ, সময় বা স্থান সম্পর্কে সিনেসিস আইটি লিমিটেডকে অবহিত করা হয়নি। কারিগরি মূল্যায়নের ফলাফল বা টেকনিক্যাল স্কোর প্রকাশ না করেই আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করা হয় এবং সিনেসিসের অজ্ঞাতে তড়িঘড়ি করে ডিএসআইয়ের অনুকূলে নোয়া জারি করা হয়।
এ ছাড়া, ই-জিপি পোর্টালে নেগোশিয়েশন, ডিব্রিফিং ও ক্ল্যারিফিকেশন সংশ্লিষ্ট ট্যাবসমূহে কোনো রেকর্ড নেই, অর্থাৎ বাধ্যতামূলক নেগোশিয়েশন ও অবহিতকরণের কোনো ধাপই সম্পন্ন হয়নি।
আবেদনে আরও বলা হয়, সিনেসিস আইটির আর্থিক প্রস্তাব ছিল ১৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, যা প্রতিদ্বন্দ্বী ডিএসআইয়ের ২০ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রস্তাবের চেয়ে কম। ফলে ডিএসআইকে বিজয়ী ঘোষণার ক্ষেত্রে কারিগরি মূল্যায়নের স্কোরই মূল নিয়ামক ছিল। কিন্তু সেই স্কোর আজও প্রকাশ করা হয়নি, যা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।
এ ছাড়া অভিযোগে বলা হয়, গত ২৪ মে দুপুরে আর্থিক প্রস্তাব খোলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে, ঈদের ছুটির ঠিক আগের দিন তড়িঘড়ি করে ডিএসআই-এর অনুকূলে ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’ জারি করা হয়। ই-জিপি পোর্টালে বাধ্যতামূলক নেগোশিয়েশন, ডিব্রিফিং ও ক্ল্যারিফিকেশন সংশ্লিষ্ট কোনো রেকর্ডই নেই। ঈদের ছুটির কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানের আপিল করার ৭ দিনের আইনি সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়ে।


