আকাশ থেকে ছবি তোলা কিংবা কেবল গোয়েন্দা নজরদারির শখ মেটানোর গণ্ডি পেরিয়ে ড্রোন প্রযুক্তি এখন আর স্রেফ শৌখিন বস্তু নয়। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এটি এখন অন্যতম প্রাণঘাতী হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার পোশাকি নাম ‘আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল’ বা ইউএভি।
এই খাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক উদ্ভাবন হলো ‘কামিকাজে’ ড্রোন। এটি এমন এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় আত্মঘাতী আকাশযান, যা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানার পর নিজে ধ্বংস হয়ে যায়। এই ‘সুইসাইড ড্রোন’ লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে প্রচণ্ড শক্তিতে আছড়ে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ এবং সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত উত্তেজনা এই আত্মঘাতী ড্রোনকে বিশ্বজুড়ে সামরিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
‘কামিকাজে’ শব্দটির উৎপত্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানি বৈমানিকদের থেকে, যারা আত্মঘাতী হামলা চালাতেন। বিশেষ করে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবার আক্রমণে এই কৌশলের ব্যাপক ব্যবহার দেখা গিয়েছিল।
বর্তমানের কামিকাজে ড্রোনগুলো সেই কৌশলেরই এক উন্নত প্রযুক্তিগত সংস্করণ। এগুলো আকাশ থেকে লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে এবং নির্ভুলভাবে আঘাত হেনে নিজেকে ধ্বংস করে। বিমান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে একসঙ্গে অনেকগুলো কামিকাজে ড্রোন উৎক্ষেপণ করা যায়, যা একই সময়ে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ড্রোনের এই ‘ঝাঁক’ বা সোয়ার্ম সক্ষমতা আকাশপথে হামলার কৌশলে এক বড় পরিবর্তন এনেছে।
ইসরায়েল এই প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে ‘হারোপ’ ড্রোন তৈরি করেছে, যা বর্তমানে বিশ্বের ১৫টিরও বেশি দেশের অস্ত্রাগারে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে ‘সুইচব্লেড’, ইরান এনেছে ‘শাহেদ’ সিরিজ, তুরস্কের আছে ‘কারগু’ এবং চীন উন্মোচন করেছে ‘সিএইচ-৯০১’।
তবে ড্রোনের উৎপাদন ও শিল্প সক্ষমতার দিক থেকে চীন সবার চেয়ে এগিয়ে। তাদের শক্তিশালী উৎপাদন ব্যবস্থায় চেংদু, শিআন এবং শেনজেন শহরের মতো কেন্দ্রগুলোতে পাঁচ হাজারেরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি কারখানা রয়েছে। ফলে অনেক দেশই এখন চীনা ড্রোন প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও চীনের তৈরি ড্রোন এগিয়ে আছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সুইচব্লেড-৬০০’ ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে সর্বোচ্চ ৪৪ মিনিট উড়তে পারে, সেখানে চীনের ‘সিএইচ-৯০১’ ড্রোন ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার গতিতে টানা ১০৫ মিনিট আকাশে থাকতে সক্ষম।
ভারতও গত দুই বছর ধরে নিজস্ব কামিকাজে ড্রোন তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে ‘ট্যাকটিক্যাল লোইটারিং মিউনিশন’ (টিএলএম), যা ৩০ মিনিটের বেশি সময় উড়তে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত তার সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিন্দুর’-এ ইসরায়েলি হারোপ এবং নিজস্ব প্রযুক্তির কামিকাজে ড্রোন ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী চীনা উন্নত অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম ব্যবহারের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি ও যুদ্ধের জন্য তুর্কি ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।
এই সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করেছে, তারা মাত্র তিন দিনে ৭৭টি ভারতীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে বেশ কিছু কামিকাজে ড্রোনও ছিল। তবে ভারত এই তথ্য নিশ্চিত করেনি, বরং তাদের দাবি ড্রোনের মাধ্যমে তারা পাকিস্তানের বেশ কিছু অবস্থানে সফলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও কামিকাজে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েল, কুয়েত, কাতার, দুবাই, বাহরাইন ও সৌদি আরব ড্রোনের ঢেউ বা ঝাঁক হামলার সম্মুখীন হয়েছে, যা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও ইরানি শাহেদ ড্রোনের পাশাপাশি কম খরচের এফপিভি (ফার্স্ট পারসন ভিউ) মিনি-ড্রোন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফ্যাক্ট ডট এমআর’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে কামিকাজে ড্রোনের বাজার ছিল ২৬৩ কোটি ডলারের, যা ২০৩৪ সাল নাগাদ এক হাজার ৯১ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তির প্রসার কেবল সামরিক অগ্রগতি নয়, বরং এটি একটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে যা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন এখন কেবল যুদ্ধের হাতিয়ার নয়, এটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের মনোবলে আঘাত হানার বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তের মাঝখানে অবস্থিত বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য কামিকাজে ড্রোন সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহারের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণ, কারিগরি দক্ষতা এবং সুনির্দিষ্ট কৌশলগত নীতিমালা প্রয়োজন।


