ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা ছিল মূলত দেশটির শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে এই দুই দেশের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। যদিও তারা পরমানু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে এই হামলার কারণ হিসেবে সামনে এনেছে, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি ছিল একটি উগ্রবাদী ইসলামি সরকারকে গায়ের জোরে উৎখাত করে একটি পুতুল সরকার বসানোর অজুহাত মাত্র।
হ্যাঁ, শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। ইরানের আয়াতুল্লাহ খামেনি সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ—একটি বিকল্প পুতুল সরকার গঠন করা যা দীর্ঘস্থায়ী হবে—তা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন ইরান বিশেষজ্ঞরা। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপের পেছনে মার্কিন জনগণ বা মার্কিন কংগ্রেসের পূর্ণ সমর্থন নেই। ফলে ইরানের অস্থিরতা এবং পশ্চিম এশিয়ার সমস্যার সাথে এখন তাদের নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে।
আমেরিকার উদারপন্থীরা এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়ে আইন ভঙ্গ করেছেন। তিনি পারমাণবিক ইস্যুতে শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিসঙ্গত সমাধানের জন্য ইরানের দেওয়া প্রস্তাবগুলোকে উপেক্ষা করেছেন; মার্কিন জনগণের সাথে পরামর্শ না করেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন।
কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ট্রাম্প প্রশাসনের এই অননুমোদিত সামরিক হামলার বিরুদ্ধে কংগ্রেসের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে খান্না বলেন, আমেরিকান জনগণ শাসন পরিবর্তনের সেই সব যুদ্ধ দেখে ক্লান্ত যা কোটি কোটি ডলার খরচ করে এবং অসংখ্য জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে। আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ৯০ কোটি মানুষের একটি দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চাই না। আমার প্রস্তাবিত ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’-এ কে কীভাবে ভোট দেবেন, তা আজই কংগ্রেসের প্রতিটি সদস্যের স্পষ্ট করা উচিত।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডক্টর ব্রহ্মা চেলানি জানিয়েছেন, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী—যিনি আমেরিকা-ইরান আলোচনার একজন প্রধান মধ্যস্থতাকারী—প্রকাশ্যে জানিয়েছেন আলোচনার সময় ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ ত্যাগ করতে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন না করার প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়েছিল। এই তথ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্প এবং তার দলের যুদ্ধের অজুহাতটি কেড়ে নেওয়া।
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কাজ করা ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, ইরানের আন্তরিকতা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি ভুল ছিল। ট্রাম্প চেয়েছিলেন ইরান তাদের শান্তিপূর্ণ প্রকল্পসহ সকল পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে দিক। ইরান এটি প্রত্যাখ্যান করে যুক্তি দেয় যে, এটি আন্তর্জাতিক আইন ও সমতার পরিপন্থী। তবে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইসরায়েল ও আমেরিকাকে সরিয়ে ওই অঞ্চলের প্রধান শক্তি হওয়ার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইরানের রয়েছে, তাকে বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না।
দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার কাছে উত্তর কোরিয়া, পাকিস্তান বা ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা গ্রহণযোগ্য। কারণ এই দেশগুলো তাদের অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করে না। কিন্তু আয়াতুল্লাহদের নেতৃত্বাধীন ইরান সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এটি পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি স্বরূপ।
আমেরিকায় যুদ্ধ এখন অপ্রিয়
ট্রাম্প এমন এক সময়ে যুদ্ধে যাওয়ার জুয়া খেলেছেন যখন আমেরিকানদের কাছে যুদ্ধ একটি অপ্রিয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৩ থেকে ১৬ জুনের মধ্যে পরিচালিত একটি জরিপ অনুসারে, মাত্র ১৬ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এই জরিপে ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির প্রতি জনঅসন্তোষ ফুটে উঠেছে।
ইউগভ-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ আমেরিকান শক্তির বদলে কূটনীতিকে সমর্থন করেছেন। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৬১ শতাংশ রিপাবলিকান রয়েছেন। গত সপ্তাহে প্রকাশিত গ্যালপ পোলে দেখা গেছে, ৪১ শতাংশ আমেরিকান ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল, যেখানে ইসরায়েলিদের প্রতি সহানুভূতিশীলের হার ৩৬ শতাংশ। এক বছর আগেও ইসরায়েলিরা ৪৬ শতাংশ বনাম ৩৩ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। অর্থাৎ আমেরিকায় এখন শান্তি, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে একটি স্পষ্ট জনমত তৈরি হচ্ছে।
সামরিক অভিযানের সমর্থক যারা
সামরিক অভিযানের সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, ইরানের নেতৃত্ব আমেরিকা ও ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর ছিল। অন্যদের দাবি, আয়াতুল্লাহদের চাপিয়ে দেওয়া মধ্যযুগীয় দাসত্ব থেকে ইরানি জনগণকে মুক্ত করতে সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। তারা মনে করেন, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং গাজার হামাসের মতো গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করা একটি অস্থিতিশীল শক্তি থেকে পশ্চিম এশিয়াকে মুক্ত করতে হবে। ইরাক ও সিরিয়াতেও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় ছিল।
ইরানি জনগণের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব নিন। এটি সম্ভবত প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে আপনাদের জন্য একমাত্র সুযোগ। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেছিলেন, শাসন পরিবর্তনই হবে ‘সবচেয়ে ভালো ঘটনা’।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো করিম সাদজাদপুর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ লিখেছেন, ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানের প্রভাবকে বিপজ্জনকভাবে বিস্তৃত করেছিলেন। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে খামেনি অত্যন্ত নৃশংসতার সাথে শাসন পরিচালনা করতেন। তিনি আমেরিকা ও ইসরায়েলকে তার বিরুদ্ধে প্রধান ষড়যন্ত্রকারী মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে টিকে থাকার জন্য আমেরিকার সাথে শত্রুতা বজায় রাখা জরুরি। সাদজাদপুরের মতে, শাসনের স্লোগান ছিল ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’, কিন্তু ‘ইরান দীর্ঘজীবী হোক’ নয়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বলেছিলেন, ইরানের শিয়া আলেমদের যুক্তিবাদী হিসেবে বিশ্বাস করা যায় না। তারা সম্পূর্ণ ধর্মীয় তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে নীতি নির্ধারণ করেন, তাই তাদের সাথে চুক্তি করা কঠিন।
সাদজাদপুর আরও উল্লেখ করেন, খামেনি ইরানের জনগণকে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। এর ফলে দেশটির মুদ্রা বিশ্বের অন্যতম অবমূল্যায়িত মুদ্রায় পরিণত হয় এবং তাদের পাসপোর্ট ও ইন্টারনেট সেন্সরশিপের কবলে পড়ে। মেধা পাচার ইরানের অন্যতম প্রধান রপ্তানি হয়ে দাঁড়ায়, যেখান থেকে বছরে প্রায় দেড় লাখ ইরানি দেশ ত্যাগ করত। খামেনি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ তৈরিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন এবং হিজবুল্লাহ, হুথি ও হামাসকে অর্থায়ন করেছেন। তার ক্ষেপণাস্ত্র শুধু ইসরায়েলেই নয়, কাতারকেও আঘাত করেছে যেখানে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে।
ইসরায়েল এর প্রতিশোধ নিতে ইরান ও তার মিত্রদের ওপর বিধ্বংসী আঘাত হানে। তেহরানে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহ, গাজায় ইয়াহিয়া সিনওয়ার এবং হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করা হয়। ইসরায়েল ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের শহর ও সামরিক স্থাপনাগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যা করে। এর মাধ্যমেই আমেরিকার জন্য ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে ১৪টি বাঙ্কার-বাস্টিং বোমা ফেলার পথ প্রশস্ত হয়।
নিজ দেশের নাগরিকদেরও ছাড়েননি খামেনি
খামেনি তার ক্ষোভ নিজের দেশের জনগণের ওপরও ঝেড়েছিলেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তিনি কঠোর দমনের নির্দেশ দেন। হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির মতে, এতে ৬ হাজার ৮০০ জন নিহত হয়। তবে টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তার তথ্যমতে, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার তাণ্ডবে নিহতের সংখ্যা ৩০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
শাসন পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে ধ্বংস করার মাধ্যমে আমেরিকা ও ইসরায়েল প্রমাণ করেছে যে, তারা বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার প্রধান শক্তি। পরবর্তী ধাপ হতে পারে ইরানে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা পুতুল সরকার বসানো, যেমনটি ভেনেজুয়েলায় চেষ্টা করেছিল আমেরিকা।
তবে মিডল ইস্ট মনিটর-এর এক নিবন্ধে টিমোথি হপার এই তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেছেন যে, বাইরের হস্তক্ষেপ কাঙ্ক্ষিত শাসন পরিবর্তন আনতে পারে। তিনি লিখেছেন, জনমনে ধারণা থাকলেও অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ বা সামাজিক অসন্তোষ সবসময় জনগন যে বিদেশি হস্তক্ষেপ বা ক্ষমতার শূন্যতা মেনে নিতে প্রস্তুত—তার লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে বাহ্যিক চাপ শাসনকে দুর্বল না করে বরং অভ্যন্তরীণ সংহতি বাড়ায় এবং জাতীয়তাবাদী অনুভূতিকে উসকে দেয়।
তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন এবং তার মিত্ররা আশির দশক থেকে এই যে নীতি অনুসরণ করে আসছে, তা কেবল ইরানের ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়নি বরং লিবিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের বদলে অস্থিরতা তৈরি করেছে। অভ্যন্তরীণ ঐক্য ছাড়া বাইরের চাপ কেবল বিশৃঙ্খলা বয়ে আনে। ইরানের শাসনব্যবস্থা কেবল দমনের ওপর টিকে নেই, বরং এর সামাজিক ও আদর্শিক ভিত্তি অনেক গভীরে। সেই অভ্যন্তরীণ বন্ধনগুলো ছিন্ন না করে বাইরে থেকে পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে।
হপারের মতে, এই পুরনো নীতি বজায় রাখা কোনো সমাধান নয়, বরং এটি পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত পরিকল্পনার অভাবকেই প্রতিফলিত করে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কেবল একটি রাজনৈতিক শাসন নয়, এটি ধর্মীয়, সামরিক ও আদর্শিক প্রতিষ্ঠানের গভীরে প্রোথিত যা দেশটির রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ। একটি পরিকল্পিত বিকল্প প্রক্রিয়া ছাড়া একে ধসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মুক্তি নয় বরং নতুন করে কাঠামোগত সহিংসতার জন্ম দেবে।


