ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছে একটি প্রতিরক্ষা শিল্প সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানস্থলে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ওই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ।
ইউক্রেন সরকারের কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই হামলার একদিন আগেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান রেথিয়নের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রতিষ্ঠানটি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির জন্য বিখ্যাত, যা রাশিয়ার ব্যবহৃত বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
কিয়েভ অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত সামরিক প্রশাসনের প্রধান রুসলান অলিইনিক ফেসবুকে জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী রুশ ক্ষেপনাস্ত্রটি একটি বেসরকারিভাবে পরিচালিত সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সামনে খোলা প্রাঙ্গণে আঘাত হানে। সেখানেই ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্প সম্পর্কিত অনুষ্ঠান চলছিল।
কাজেই রুশ হামলায় রেথিয়নের কোনো কর্মী হতাহত হয়েছেন কি না- এ বিষয়ে জানতে চেয়ে পাঠানো ইমেইলের জবাবে প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উৎপাদনের লাইসেন্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে রেথিয়নের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জেলেনস্কির এই বৈঠক হয়।
অলিইনিক জানান, স্থানটি কিয়েভ নগরের কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে বুচা জেলায় অবস্থিত। হামলার পর জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ সময় ২৭টি বাড়ি এবং ৪৪টি যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র এখন এক নম্বর অগ্রাধিকার।’ একই পোস্টে তিনি রাশিয়ার হামলার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
ইউক্রেনের বেসরকারি প্রতিরক্ষা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সংগঠন ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা শিল্প পরিষদ জানিয়েছে- হামলার সময় তাদের শিল্প–সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাদের হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইউক্রেনের অ্যাটর্নি জেনারেল রুসলান ক্রাভচেঙ্কো হামলার ঘটনায় যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করেছেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠান আয়োজনে সম্ভাব্য নিরাপত্তা অবহেলার অভিযোগেও আলাদা একটি ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে।
কে এই স্থান, সময় ও আয়োজনের ধরন অনুমোদন করেছিলেন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না- তদন্তকারীরা তা খতিয়ে দেখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন ক্রাভচেঙ্কো।
এদিকে হামলার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশে ইউক্রেন সরকার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

এর আগে শুক্রবার রাশিয়ার একটি সামরিক কারখানায় ইউক্রেনের হামলায় ছয়জন নিহত এবং আরও ২৬ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওই অঞ্চলের গভর্নর।
রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের লজিস্টিক কেন্দ্রগুলোতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা তাতিয়ানা কিম জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘সেন্ট পিটার্সবার্গ, পার্শ্ববর্তী লেনিনগ্রাদ অঞ্চল এবং অবৈধভাবে দখল করা ক্রিমিয়ার সিমফেরোপল শহরে ওয়াইল্ডবেরিজের লজিস্টিক স্থাপনাগুলো হামলার শিকার হয়েছে।’
এ সময় রুশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে সেন্ট পিটার্সবার্গের আকাশে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
এর আগের কয়েক দিনে ইউক্রেন রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়াইল্ডবেরিজের আরও চারটি গুদামে হামলা চালায়।
শুক্রবার জেলেনস্কি জানান, ইউক্রেনের দূরপাল্লার অস্ত্র রাশিয়ার একটি তেল স্থাপনা এবং একটি সামরিক কারখানায় সফল হামলা চালিয়েছে। তেল স্থাপনাটি ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় এক হাজার ৩৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
তিনি বলেন, কিরভ অঞ্চলের ওই সামরিক কারখানায় ইউক্রেনের শহরগুলোতে হামলায় ব্যবহৃত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরি হয়।
কিরভ অঞ্চলের গভর্নর আলেকজান্ডার সোকোলভ জানান, ওই সামরিক কারখানায় ইউক্রেনের হামলায় ছয়জন নিহত এবং ২৬ জন আহত হয়েছেন।
তিনি কারখানাটির নাম উল্লেখ না করলেও অনলাইন সংবাদমাধ্যম আস্ত্রা জানিয়েছে, সেটি ছিল অ্যাভিটেক কারখানা, যেখানে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান–সংক্রান্ত যন্ত্রাংশ তৈরি হয়।
কিয়েভের কর্মকর্তারাদের মতে, সাধারণ রুশ নাগরিকরাও যেন যুদ্ধের প্রভাব অনুভব করে এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন কি না- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, সে কারণে হামলা জোরদার করা হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনের ৫৭১টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।


