জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান ঘিরে ঢাকার আশুলিয়ায় জীবিত একজনের সঙ্গে পাঁচটি লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম, এফএফএম সায়েদ, আবদুল মালেক, বিশ্বজিৎ সাহা, মুকুল চোকদার, রনি ভুইয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।
এছাড়া সৈয়দ নুরুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান রিপন, আবদুল্লাহিল কাফি, শাহীদুল ইসলাম, মাসুদুর রহমান, নির্মল কুমার দাস, আরাফাত হোসেন আরজুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আরাফাত উদ্দিন ও কামরুল হাসানকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করা হয়েছে।
সাইফুল ইসলামের সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, এগুলো ভিকটিমদের পরিবারের মধ্যে বন্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রায়ে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করে। অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এর আগে উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২০ জানুয়ারি মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়। ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম ও চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এরপর আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান ও এসএম মিরাজুল আলম আজমান।
এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, এসআই আবদুল মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদার। তবে সাবেক এমপি সাইফুলসহ আটজন এখনও পলাতক রয়েছেন।
গত বছরের ২১ আগস্ট এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মামলার বিচার শুরু হয়। ওই সময় উপস্থিত আট আসামির সাতজনই নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তবে দোষ স্বীকার করেন এসআই শেখ আবজালুল হক। তিনি রাজসাক্ষী হয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এর আগে ২ জুলাই এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যসূত্র হিসেবে ৩১৩ পৃষ্ঠা, সাক্ষী ৬২, দালিলিক প্রমাণাদি ১৬৮ পৃষ্ঠা ও দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করা হয়। পরে এ মামলায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। পলাতক আট আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। তবে তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার কার্য অনুষ্ঠিত হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকা জেলার আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ছয়জন। এরপর পুলিশ ভ্যানে তাদের লাশ তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রসিকিউশন জানায়, নৃশংস এ ঘটনার সময় একজন জীবিত ছিলেন। কিন্তু তাকেও বাঁচতে দেননি তারা। পেট্রোল ঢেলে জীবন্ত মানুষকেই পুড়িয়ে মারা হয়। এর আগের দিন একজন শহীদ হন। ওই ঘটনায় শহীদদের মধ্যে রয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন (সজল), আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বুসতামি ও আবুল হোসেন। এছাড়া একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত করে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত সংস্থা।
এর আগে গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির মামলার রায় ঘোষণা করে আদালত। রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড, রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে রাজধানীর চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আদালত। মামলার বাকি পাঁচ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।


