গুম ও হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, র্যাবে যোগদানের প্রথম রাতেই জিয়াউল আহসানকে চোখ বাঁধা এক বন্দীর মাথার পেছনে গুলি করে সেতুর নিচে ফেলে দিতে দেখেছেন।
রোববার ট্রাইব্যুনালে ৫৫ বছর বয়সী এই সাবেক সেনা কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী এবং আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাহিদুর রহমান।
সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, এরপর তাকে একই ধরনের আরেকটি অভিযানে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষ্য, সেই সিদ্ধান্তের পর তাকে তিরস্কার করা হয়, ভয় দেখানো হয় এবং পরদিনই র্যাব থেকে সরিয়ে সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়।
তিনি আরও জানান, ২০১১ সালে সরকারি আদেশে তাকে র্যাবে বদলি করা হয় এবং ৫ জুলাই র্যাব সদর দপ্তরে যোগ দেন। সেখানে ছয় দিনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষে ১১ জুলাই তাকে র্যাব-৩-এ পদায়ন করা হয়। সে সময় র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান।
র্যাব-৩-এ যোগদানের দিনই তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল রফিকুল ইসলাম তাকে জানান, সেদিন রাতে একটি অভিযানে অংশ নিতে হবে, যা জিয়াউল আহসানের নির্দেশে পরিচালিত হবে। রাত ১১টার দিকে সাদা পোশাকে কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি র্যাব সদর দপ্তরের সামনে পৌঁছান। পরে চারটি গাড়ির বহর টঙ্গী হয়ে একটি নির্জন এলাকায় যায়।
সাজ্জাদুল ইসলামের দাবি, একটি সেতুর ওপর গাড়ি থামানোর পর চোখ ও হাত বাঁধা একজন বন্দীকে নামানো হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়াউল আহসান ওই ব্যক্তিকে সেতুর রেলিংয়ের কাছে নিয়ে গিয়ে মাথার পেছনে গুলি করেন এবং পরে নিচে ফেলে দেন। ঘটনাটি দেখে তিনি হতবিহ্বল হয়ে পড়েন বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, কিছু দূর এগিয়ে আরেকটি সেতুর ওপর গাড়ি থামানো হলে জিয়াউল আহসান তাকে একটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন’ পরিচালনার নির্দেশ দেন। তিনি এর অর্থ জানতে চাইলে জিয়াউল আহসান ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ইংরেজিতে তিরস্কার করেন এবং গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসতে বলেন। তিনি ট্রাইব্যুনালকে জানান, নির্দেশ অমান্য করার পর তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, তাকে হয়ত ভুয়া বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় হত্যা করা হতে পারে, চাকরি হারাতে হতে পারে কিংবা দুর্গম এলাকায় বদলি করা হতে পারে।
তার ভাষ্য, গাড়ির ভেতরে বসে থাকা অবস্থায় তিনি গুলির মতো একটি শব্দ শুনতে পান। পরে আরেকটি স্থানে চোখ বাঁধা একজন ব্যক্তিকে কয়েকজন টেনে নিয়ে যেতে দেখেন, কিন্তু তাকে আর ফিরে আসতে দেখেননি। এরপর আরও কয়েকটি স্থানে গাড়ি থামলেও তিনি আর গাড়ি থেকে নামেননি। অভিযানের শেষে তাকে ক্যান্টনমেন্টের স্টাফ রোডে নামিয়ে দেওয়া হয়।
পরদিন, ১২ জুলাই, র্যাব-৩-এ যাওয়ার পথে তিনি জানতে পারেন তাকে র্যাব থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। র্যাব-৩-এ পৌঁছানোর পর তাকে সরাসরি কুমিল্লা সেনানিবাসের অর্ডন্যান্স ডিপোতে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী র্যাব থেকে ফেরত আসা কর্মকর্তাদের আগে সেনা সদরে রিপোর্ট করার কথা থাকলেও তার ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
সাক্ষী দাবি করেন, ঘটনার তিন থেকে চার দিনের মধ্যে একটি জাতীয় দৈনিকে গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনটি লাশ উদ্ধারের সংবাদ প্রকাশিত হয়।
সাজ্জাদুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে জানান, ওই ঘটনার পর সেনাবাহিনীতে তাকে একজন অবিশ্বস্ত ও অবাধ্য কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তার দাবি, সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও এরপর আর পদোন্নতি পাননি এবং অবসরের নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১২ বছর আগেই ২০১৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসর নেন তিনি।


