দেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো বর্তমানে আবারও নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, এসব উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা অনলাইন এবং অফলাইন উভয় মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ইতিমধ্যে জঙ্গিদের বেশ কিছু গোপন তৎপরতা শনাক্ত করেছে। এই ধরনের কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছে অন্তত পাঁচজন।
গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে আছে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর, যার বিরুদ্ধে অনলাইনে উগ্রবাদ ছড়ানোর ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালনের অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ওই কিশোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আদর্শ প্রচার করত। সে অনলাইনে নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং বোমা তৈরির নির্দেশিকা সংবলিত পিডিএফ ফাইল বিতরণ করত।
এছাড়া সে তার সহযোগীদের মাধ্যমে শিয়া মসজিদ, পুলিশের চেকপোস্ট এবং ইসকন মন্দিরে হামলার উসকানি দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সিটিটিসি কর্মকর্তারা এই কিশোরকে গ্রেপ্তারের পর একটি বৃহত্তর জঙ্গি নেটওয়ার্কের বিস্তারিত তথ্য পেয়েছেন। এই গোষ্ঠীর পরিকল্পনাগুলোর সাথে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া ঘটনার মিল পাওয়া যাচ্ছে।
গত ২ এপ্রিল সিটিটিসি কর্মকর্তারা হবিগঞ্জ থেকে সেই কিশোর সন্দেহভাজনকে আটক করেন। তার সাথে আগে গ্রেপ্তার হওয়া আহসান জহির খান, ড্যানিয়েল ইসলাম হাসান এবং রাসেল ওরফে পলাশের যোগাযোগ ছিল বলে জানা গেছে। এর আগে ৩১ জানুয়ারি সিটিটিসি ঢাকার জিয়া উদ্যান থেকে ৫০ বছর বয়সী আহসান জহির খানকে গ্রেপ্তার করে। কর্তৃপক্ষ তাকে নিষিদ্ধ সংগঠন জেএমবি’র সদস্য হিসেবে শনাক্ত করেছে। তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রয়েছে।
সিটিটিসি প্রধান মো. মাসুদ করিম জানান, আটক কিশোরকে আদালতের নির্দেশে সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ওই কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। কোনোভাবেই যাতে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে উগ্রবাদের অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি জঙ্গিদের সাহসী করে তুলেছে। মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে কেউ কেউ জনসমাবেশে অংশ নিয়েছেন, সেখানে নিজেদের পুনর্গঠিত করার সুযোগ তৈরি করছেন।
সিটিটিসির ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, জঙ্গি নেটওয়ার্কের খোঁজ রাখা একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা। তিনি বলেন, একজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে প্রায় দুই থেকে তিন মাস সময় লাগে। প্রতিটি গ্রেপ্তার থেকে নতুন কোনো যোগসূত্র বেরিয়ে আসে। জঙ্গিরা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বর্তমানে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনের বিষয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান ইলিয়াস কবির।
তবে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরেই এখন ভিন্ন ভিন্ন মত দেখা যাচ্ছে। সিটিটিসি কর্মকর্তারা যখন জঙ্গি সক্রিয়তার প্রমাণ দিচ্ছেন, তখন অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান দেশে সংগঠিত কোনো জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই বলে দাবি করেছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরনের স্ববিরোধী অবস্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতীতেও এই ধরনের আত্মতুষ্টির সুযোগ নিয়ে জঙ্গি সংগঠনগুলো পুনরায় শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে বর্তমানে উগ্রবাদ বিরোধী সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের পলাতক সদস্যরা এখন এই ফাঁকটুকুই কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক সময়ের কিছু বিস্ফোরণ ও হামলার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। কেরানীগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং শরীয়তপুরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ফরিদপুরে স্কুলব্যাগের ভেতর বোমার সন্ধান পাওয়া গেছে। যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের চেকপোস্টে এক কর্মকর্তার ওপর ছুরি নিয়ে হামলা হয়েছে, মোহাম্মদপুরে একটি রহস্যজনক বিস্ফোরণ ঘটেছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই ঘটনাগুলোর ধরনের সাথে জঙ্গি যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কিছু ঘটনার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি।
জঙ্গিবাদ দমনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উদ্বেগ এবং আন্তঃসীমান্ত যোগসূত্রের বিষয়গুলো এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি দিল্লির কাছে লস্কর-ই-তৈয়বা নামক সংগঠনের এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে। গ্রেপ্তার হওয়া শাব্বির আহমদ লোন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর নির্দেশে বড় ধরনের নাশকতার পরিকল্পনা করছিলেন বলে জানা গেছে। তিনি বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছে ভারতের পুলিশ।
ভারতীয় তদন্তকারীদের মতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং নেপাল জুড়ে এই জঙ্গি নেটওয়ার্ক বিস্তৃত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনিরুজ্জামান টাইমস’কে জানান, দেশ থেকে জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও ২০২৪ সালের আগস্টের পর জঙ্গি বিরোধী কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কর্মীরা এখন আর দায়িত্বে নেই। জঙ্গিরা এই সুযোগটি গ্রহণ করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ভারতে জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাংলাদেশেও ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। কারণ উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত সমন্বয় করে থাকে।
বর্তমানে জঙ্গিরা তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ছদ্মনামে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে এটিইউ প্রধান মো. রেজাউল করিম জঙ্গিদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানের বিস্ফোরণগুলোকে স্থানীয় বিবাদ বা বোমা তৈরির সময়কার দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি আরও জানান, দিল্লির গ্রেপ্তারের বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের পুলিশের সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি।
গত কয়েক মাসের ঘটনার দিকে তাকালে দেখা যায়, জানুয়ারি মাসে ফরিদপুরে একটি ব্রিজের ওপর স্কুলব্যাগের ভেতর থেকে একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে সেটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে যাত্রাবাড়ীতে ব্যাগ তল্লাশির সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাত করে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। ফেলে যাওয়া ব্যাগে বিস্ফোরক ছিল বলে জানা গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে দুইজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়।
জানুয়ারি মাসে শরীয়তপুরে একটি বাড়িতে বিস্ফোরণে একজন মারা যান এবং দুইজন গুরুতর আহত হন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ চারজন আহত হন। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় বোমা তৈরির সরঞ্জাম।
মোহাম্মদপুরে একজন বিতর্কিত ধর্মীয় বক্তার বাসভবনের কাছে ডিসেম্বর মাসে হওয়া বিস্ফোরণের রহস্য এখনও সমাধান হয়নি। যশোরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে একটি বাড়ি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ এবং গ্রেনেড সদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়, যা পরে সেনাবাহিনী ধ্বংস করে।


