জুবায়ের তানিন, দুবাই থেকে
ভারতের বিপক্ষে সুপার ফোরের ম্যাচে সাইফ হাসান একের পর এক স্লগ সুইপ করছেন, লফটেড ড্রাইভ করছেন আর বল উঠছে আকাশে। কিন্তু দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ভারতের ফিল্ডাররা সেসব ক্যাচ আর হাতে রাখতে পারেননি। ৪০, ৬৫, ৬৬ ও ৬৯ রানে চার বার ক্যাচ তুলে জীবন পেয়েছেন এই ডানহাতি। কিন্তু পঞ্চমবারে আর রক্ষা পেলেন না। জাসপ্রিত বুমরাহর বলে তুলে মারতে গিয়ে লং অনে ধরা পড়েছেন অক্ষর প্যাটেলের হাতে। কার্যত ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ জেতার আশাটাই মিইয়ে গেছে তখন।
সাইফের ৫১ বলে ৬৯ ছাড়া বলার মতো ইনিংস নেই। ১৬৯ রান তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ গুটিয়ে গেছে ১২৭ রানে। চার বল আগে হেরে যাওয়া এই ম্যাচে বাংলাদেশের ফাইনালের ভাগ্য ঝুলে রইল আগামীকাল তাদের পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আসন্ন ফলাফলের ওপর। ৪১ রানের এই জয়ে ভারত উঠে গেল ফাইনালে।
কিন্তু ভারতকে ১৬৮ রানে আটকে রাখার কঠিন কাজটা করে ফেলার পরও বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে দেখাল উল্টো চেহারা। নইলে টপ অর্ডার থেকে কেন আরো একটা বড় ইনিংস আসবে না? ফিফটি না পেরোক, অন্তত সাইফের সাথে তাল মিলিয়ে কেউ একজন ব্যাট হাতে দাঁড়ালেও গল্পটা ভিন্ন হতে পারত। সাইফ আর পারভেজের ইনটেন্ট ছাড়া বাকি সবাইকেই কাঠগড়ায় তুলতে পারেন আপনি।
তাওহিদ হৃদয় থেকে শুরু করে মিডল অর্ডারের রিশাদ হোসেন পর্যন্ত সবাই আউট হয়েছেন সিংগেল ডিজিটে। অক্ষরকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন হৃদয়, শামীম বোল্ড হয়েছেন বরুণের বলের লাইন মিস করে। অধিনায়ক জাকের নিজেকে দুর্ভাগা ভাববেন কিনা কে জানে। নইলে এক্সট্রা কভার থেকে সূর্যকুমার যাদবের মারা বলটা উইকেটে লাগে না। সাইফউদ্দিনের সামনে সুযোগ ছিল নায়ক হওয়ার। কিন্তু বরুণের শর্ট বল পেয়েও যেভাবে হেলায় উইকেটটা দিয়ে এসেছেন লং অনে একটা হাফ হার্টেড শট খেলে, তাতে গেম সেন্স নিয়েও আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন চাইলে।
ভারতের বিপক্ষে সুপার ফোরের ম্যাচের আগে চোট পেয়েছেন লিটন দাস। তার বদলে নেতৃত্বে জাকের আলী অনিক। একাদশে চার বদল, ব্যাটিং অর্ডারেও এসেছে ছোট অদলবদল। ওপেনার তানজিদ হাসান নিজের উইকেট গিফট করে এসেছেন যেন কিছু বুঝে ওঠার আগেই। দুই ম্যাচ পর একাদশে ফেরা পারভেজ ইমন ১৯ বলে ২১ রানের ইনিংসে সাইফকে সঙ্গ দিয়েছেন দ্বিতীয় উইকেটে ৪২ রানের জুটিতে।
এর আগে টসে হেরে ব্যাট করতে নেমে অভিষেক শর্মা আর শুবমান গিলের ঝড়ে পাওয়ারপ্লেতে ৭২ রান তোলে ভারত। তাদের ওপেনিং জুটিতে ৭৭, যার ৭২-ই এসেছে পাওয়ারপ্লেতে। কতটা ভয়ংকর ছিলেন দুজন? তাদের জুটির ব্রেকডাউন দেখলেই বুঝতে পারবেন। তানজিম-নাসুমদের করা প্রথম তিন ওভারে এসেছে মাত্র ১৭। কিন্তু পরের ১৮ বলে পাঁচ চার আর চারটি ছক্কায় দুজন মিলে তুলেছেন ৫৫ রান।
তারা ঝড় তুলবেন ব্যাপারটা অনুমিতই ছিল। শুবমান-অভিষেক; দুজনের ব্যাট যেভাবে চলছিল, তাতে ২০০ বা এর কাছাকাছি কিছু স্কোরও অস্বাভাবিক কিছু হতো না, বিশেষত ভারতের ব্যাটিং অর্ডারের ডেপথ বিবেচনায়। কিন্তু শুরুর সেই বেধড়ক মার খেয়ে বাংলাদেশ সামলে উঠল দারুণভাবে। মিডল ওভারে ভারতের ৫ উইকেট তুলেছে মাত্র ৬৩ রান দিয়ে। মাঝে আর তেমন বড় কোনো জুটিও হয়ে উঠেনি, অভিষেক আর সূর্যকুমারের ১৮ বলে ২৯ ছাড়া। সব মিলিয়ে ভারতের মতো ছন্দে থাকা দলকে ১৬৮ রানে আটকে রাখতে পারাটাও বাংলাদেশের বোলিং ইউনিটের কৃতিত্বই বটে। আরো একটা পরিসংখ্যান জানিয়ে রাখা ভালো, শেষ ৫৩ বলে ভারত মাত্র ৫৬ রান তুলেছে, তাও তিন উইকেট হারিয়ে।
শুরুর ঝড়ের পর সপ্তম ওভারে বল করতে এসে প্রথম ডেলিভারিতে চার খেলেও এক বলের ব্যবধানে শুবমানের উইকেট নিয়েছেন রিশাদ। ফুল লেন্থ বলে তুলে মারতে গিয়ে লং অফে তানজিমের হাতে ব্যক্তিগত ২৯ রানে ক্যাচ দেন এই ডানহাতি ব্যাটার। ভাঙে ৭৭ রানের ওপেনিং জুটি। অন্য প্রান্তে ঝড় তোলা অভিষেক তিন ছক্কা আর চারটি চারে ফিফটি পেয়েছেন ২৫ বলে। অবশ্য ব্যক্তিগত ১ রানে তানজিমের বলে জাকেরের হাতে ক্যাচ দিয়ে জীবন পেয়ে সেটা কাজেও লাগিয়েছেন দারুণভাবে। তৃতীয় ওভারে তানজিমের আউট সুইংগার তার ব্যাটের কানা ছুঁয়ে ফার্স্ট স্লিপের দিকে যাচ্ছিল, জাকের বাঁয়ে ঝাঁপিয়েও বল গ্লাভসে রাখতে পারেননি।
অভিষেক শেষ পর্যন্ত আউট হয়েছেন পয়েন্ট থেকে রিশাদের দুর্দান্ত এক থ্রোতে মোস্তাফিজের হাতে। ৩৭ বলে ৭৫ রান করেছেন এই বাঁহাতি ওপেনার, ইনিংসে পাঁচ ছক্কা আর চারটি চার। যদিও ভারতের এই ছক্কাবৃষ্টির মধ্যে বেশ আঁটসাঁট বলই করেছেন রিশাদ। নিজের দ্বিতীয় ওভারে ফিরে নিয়েছেন শিভাম দুবের উইকেটও।
অধিনায়ক সূর্যকুমারও ইনিংস বড় করতে পারেননি আজ। মোস্তাফিজের ১৫০ নম্বর টি-টোয়েন্টি উইকেট হিসেবে আউট হয়েছেন তিনি, অধিনায়ক জাকেরের হাতে ক্যাচ দিয়ে। তিলক ভার্মাকে থামিয়েছেন প্রথম তিন ওভারে মাত্র ১৫ রান দেয়া তানজিম। চার ওভারের স্পেল শেষ করেছেন ২৮ রানে ১ উইকেট নিয়ে। প্রথম তিন ওভারে ৩৩ রান দেয়া সাইফউদ্দিন করেছেন ইনিংসের শেষ ওভার। তবে সবাইকে অবাক করে হার্দিক পান্ডিয়াকে স্ট্রাইকে রেখেও মাত্র চার দিয়েছেন এই ডানহাতি পেসার, উইকেটও পেয়েছেন একটা।


